বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা



বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

-এস জে রতন

মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ;
বিশ্বাসে তবে কি মেলাবে তত্ত্ব, সফল হবে কি পড়া এই তাবিজ?
নব্য যারা বুঝবে কি লক্ষ্য, নেয় যদি বাহ্যিক শক্ত পক্ষ?
রবে কালহীন কালান্তরের সভ্যতা, সতত যা পর-মর্তে পবিত্র বক্ষ!
এফএম রেডিও’র ধারণা তখনো কেউ মাথায়ই আনতে পারেনি। ঝন্টু নামের এক স্কুল বন্ধু কথা বলাতে বেশ পারদর্শী ছিল। কত কথা যে কোন মুহূর্তেই সাজিয়ে গুছিয়ে, কোন সময় ক্ষেপণ না করে ঝটপট মজা করতে করতে চালিয়ে যেতে পারতো ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা ছাড়া আর কোন রেডিও’র প্রচার ছিল না। ঘোষক ঘোষিকাগণ কত স্পষ্ট করে শুদ্ধ উচ্চারণে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান ঘোষণা করতেন। এই ঝন্টুর কথা এখন মনে পড়ছে। এখন এফএম রেডিও’র যে দাপট আর আরজেদের যে অবস্থা, তাতে করে ঝন্টুর কথা খুব মনে পড়া স্বাভাবিক। একদিন তমালসহ তার আন্যান্য বন্ধুরা ঝন্টুর চটপটে কৌতুকভরা কথামালায় এমনভাবে বুঁদ হয়ে গেল, যে কখন ক্লাস শুরু হয়ে প্রায় শেষ হতে চলেছিল কেউই বুঝতেই পারেনি। সাপের মতো পেঁচানো কালো ডোরাওয়ালা বেত হাতে শিক্ষক মহোদয় রাগে গজগজ করে, স্কুলের আঙ্গিনায় গাছের ছায়ার নিচে বসে ঝন্টুকে শোনার আড্ডায় হাজির। সময় বেশি নেননি স্যার। ঝপাৎ ঝপাৎ করে তমালদের পাঁচ-ছয়জনের পিঠে প্রচন্ড বেতের বাড়ি। বাড়ির আঘাতে একেকজন বাইম মাছের মতো বাঁকা হয়ে চিৎকার করে উঠছিল। কোন রকমে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখা গেল শিক্ষক মহোদয় দৌড়াচ্ছেন। কোন দিকে? ঝন্টুর পিছু নিয়েছেন উনি। মানে, ঝন্টু মুহূর্তেই টের পেয়ে বাঘের মুখে তার বাকি শ্রোতা-বন্ধুদের রেখে, বেতের বাড়ি থেকে দূরে থাকতে ভোঁ দৌড় দিয়েছে। কত চটপটে আর প্রত্যুৎপন্নমতি ছিল সে! শেষ পর্যন্ত শিক্ষক সাহেব ঝন্টুকে আর ধরতে পারেনি। শিক্ষক রাগে ক্ষোভে চটে গিয়ে বলছিলেন- কালকে আসবি না ক্লাসে? সেদিন দেখাবো। তমালরা ক্লাসে গিয়ে কান ধরে নীল ডাউন হয়ে থাকলো। মনে মনে ভাবতে থাকলো কত বোকা তারা। ঝন্টু তো তাদেরই বন্ধু, একই বয়েসি, অথচ কতো বুদ্ধি তার! সে-ই আমাদের চটকদার গল্প শুনিয়ে ক্লাস মিস করালো আবার স্যারের বেতের বাড়ি থেকেও নিজেকে নিরাপদে রাখলো।

ঝন্টু পরেরদিন ক্লাসে ঠিকই আসলো। সেদিন তাকে পড়ায় খুব মনোযোগী মনে হলো। সেই শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন। হাতে যথারীতি সাপের মতো পেঁচানো কালো দাগওয়ালা বেত। ভয়ে ঝন্টু ছাড়া অন্যান্যদের গা শিউরে উঠছিল। কি জানি কতো মার মারবে আজ ঝন্টুকে! ঝন্টুর দিকে বন্ধুদের কেউ কেউ তাকিয়ে ভয়ে কেঁদেও ফেললো। কিন্তু ঝন্টু নির্বিকার। যেন কিছুই সে জানে না। স্যার জিজ্ঞেস করলেন- ঝন্টু, কাল কি অপরাধ করেছো তুমি জানো? ঝন্টুর কোন উত্তর নেই। স্বাভাবিক। ঝন্টু, আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ না? স্যার বেত নিয়ে অগ্নিমূর্তি হয়ে ঝন্টুর কাছে এসে চড়াও হওয়া মাত্র বেঞ্চ থেকে ধপাস করে পড়ে গেল ঝন্টু। কাঁপতে থাকল। মৃগীরুগীর মতো। স্যার প্রায় বেআক্কেল হয়ে গেলেন। কি ব্যাপার না মারতেই এমন হলো? সবার চোখ চড়কগাছ। শিক্ষক- বিষয়টার সাথে উনি যুক্ত নন, এমন একটা ভাব করে বেতটা ক্লাসের এক কোনায় লুকিয়ে রেখে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। একটু পর ঝন্টু নিজে নিজেই ঠিক হয়ে গেল। এরপর অন্য ক্লাসগুলো ঠিকভাবেই সম্পন্ন করল ঝন্টু। এই বিষয় নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি করতে গেলে আবার কি থেকে কি হয়, তাই ঐ শিক্ষক আর এ ব্যাপারে সারাদিন কোন উচ্চবাচ্য করেননি। ক্লাস শেষে একসাথে বাড়ি ফেরার পথে ঝন্টু হাসতে হাসতে কথার ফুলঝুরিতে বন্ধুদের সাথে বলছিল- দেখলি তো কেমন করে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হয়? ঝন্টুর চটকদার কথামালায় ক্লাস মিস করিয়ে দেয়া, কথার মারপ্যাঁচে কারো পেন্সিল নেয়া, খাতার পাতা ছিঁড়ে নেয়া, পরীক্ষার হলে উঁকি দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেখা আবার যে দেখালো তাকেই বেতের মার খাওয়ানো, এই রকম বহু ঘটনার ওস্তাদ এই ঝন্টু। এটা একটা সিম্বলিক প্যাসেজ। সমাজেও এই ধরনের লোক বসবাস করছে। যাদের লক্ষ্যই যেন অন্যের সরল বিশ্বাসকে পূঁজি করে বোকা বানিয়ে ঠকিয়ে নিজে জিতে যাওয়া। কিন্তু এটা কি সত্যিই জিৎ?
ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই?
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।
চোখ দু’টো তোর ডাগর ডাগর যেন গেঁয়ো ভূত,
এতো আলো কোথায় পাস, তুই কি স্বর্গের দূত?
লক্ষ্মী ছেলে আয় না কাছে কোলে তুলে লই,
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।

এই গানের কথাগুলো প্রায়ই মনে পড়ে, যখন ট্রেনে করে গ্রামের বাড়ি যায় তমাল। মনে পড়ে কিছু স্মৃতিও। একবার ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা দিতে দশ বার জন বন্ধু মিলে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। জার্নি বাই ট্রেন। এখনকার মতো ট্রেনে তখন যাত্রীদের অতো হুড়োহুড়ি ধাক্কাধাক্কি ছিল না। সীটের পর সীট ফাঁকা পড়ে থাকতো। রাতের ট্রেন, সারারাত ভ্রমণের পর সিলেট পৌঁছাতে হবে। একবন্ধু বলে উঠলো- দোস্ত, দিনে গেলে কি হতো? রাত্রে কি ট্রেনে কোন হুর-পরী থাকে? জার্নিতে পাশের সীটে বা চোখাচোখি সীটে দু’একজন চোখ ধাঁধাঁনো রাজকন্যা না থাকলে জমেই না। কেমন একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার থাকে। একেক বন্ধুর একেক বাতিক যেন, কেউ হয়তো কালকের ভর্তি পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন আসতে পারে, তা নিয়ে ভাবনা আবার কারো বা তর্ক বা গল্প বা রাজনীতি নিয়ে বাতচিৎ। একটু প্রেম পিয়াসী টাইপের বন্ধুটি অস্থির যেন বেশি। খুব বেশি সময় ধরে সীটে বসে থাকতে পারে না। এই আসছি, পা-দু’টো ধরে আসছে, একটু হেঁটে আসি বলে কোথায় যে যায়? আবার হঠাৎ কোত্থেকে যেন উড়ে এসে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প জমায়। দোস্ত, পরের কম্পার্টমেন্টে একটা পরী আছে। চল্ কথা বলার চেষ্টা করি। জার্নিটা মধুর লাগবে। সম্ভবত সে-ও ভর্তি পরীক্ষা দিতেই যাচ্ছে। রাকিব এই বন্ধুর সাথে উঠে চলে গেল পরের কম্পার্টমেন্টে। বাইরে চাঁদের আলো। পূর্ণিমার চাঁদ হবে সম্ভবত। কম্পার্টমেন্টের ভেতরে নন-এনার্জি বাল্বের সয়াবিন তেল রঙের আলো। কপোলের একপাশে চাঁদের রূপালী আলো আরেক পাশে বাল্বের আলোর প্রক্ষেপণ। হাল্কা বাঁকা হয়ে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ। জানালা খোলা। ঝিরঝির পবন বইছে। প্রেম পিয়াসী বন্ধুটি কবিতার পাশাপাশি মাঝে মাঝে ছবিও আঁকে। তার এই বর্ণনা স্বাভাবিক প্রেমিক মনের। সামনের দু’টি সীটই ফাঁকা। ইচ্ছের সাথে কপালের প্রেম যাকে বলে! দুই বন্ধু বসে পড়ল। ভাবখানা এমন যে ওদের নিজেদের টিকেটের সীটেই বসলো ওরা। মেয়েটি সুন্দরী মায়াবী তবে একটা গম্ভীর ভাবও আছে চোখে মুখে। পাশে তার গার্ডিয়ান মনে হলো। তবে উনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বার বার মেয়েটির কাঁধে ঝুঁকে পড়ছিলেন। মেয়েটি কখনো আলতো পরশে তাঁর মাথাটিকে কাঁধে জায়গা দিচ্ছিল আবার কখনো যতœ করে সোজা করে দিচ্ছিল। মজা করে অস্ফূট স্বরে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কানে কানে বলল- পিরিতের কলসী হলে হায় গো/আদরে কাঙ্খে নিতাম/ভালবাসার জল ভরিয়া/আদরে ধরে রাখিতাম।
মেয়েটির সাথে কয়েকবার চোখাচোখি হলো রাজনের। মায়াবী চোখ। মনে হলো কিছু বলা যায়। -সিলেটে যাচ্ছেন? আমাদের ভর্তি পরীক্ষা, আপনার…? -জি, হ্যাঁ আমারও একটা পরীক্ষা আছে। -কি পরীক্ষা? -চাকরীর। -পড়াশোনা? -আমি এই বছরেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছি। আমার হাজব্যান্ড সিলেট মেডিকেলের অধ্যাপক, আমিও সেখানেই জয়েন করার চেষ্টা করছি। পাশের লোকটিকে দেখিয়ে -আমার হাজব্যান্ড গতরাতে জার্নি করে আমাকে সাথে নিয়ে যাবার জন্য ঢাকায় এসেছিল, তাই বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে বেশ ঘুমুচ্ছে সে। রাজন- দোস্ত আমি একটু আসছি। -আরে কোথায় যাচ্ছিস? চল আমিও যাচ্ছি। -আরে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? বলে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকালো মেয়েটি। এই দুই বন্ধু সেই আগের সীটে এসে বসল। অন্যবন্ধুরা জিজ্ঞেস করল- কি রে পরী কি উড়াল দিল। নাকি ছ্যাঁকা দিল? রাজন- আর বলিস না, কে জানে অমন কিউট আর কচি একটা মেয়ে বুড়ো ডাক্তারকে বিয়ে করেছে! আর মুখটাকে অতো অল্পবয়েসি করে না রাখলেই বা কি দোষ হয় মেয়েদের। আমাদের বাড়া ভাতে লাল ব্রিটিশদের দখলদারী আর কি! দুই বন্ধুর ধারণা থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাস ভেঙ্গে খানখান হলো প্রেমের অনুভূতির। মেয়েটির অবয়বেও এমন কিছু ছিল যা সাধারণকে বোকা করে দিতে পারে। সমাজে এমন উদাহরণও বেশ। তাই অন্যকে মূল্যায়ন করার পূর্বে আরো ভাবার, বিশ্লেষণ করার ব্যাপারগুলোকে নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের ভাবিত বিশ্বাস যেন যথাযথের কাছিকাছি হয়, না হলে, বিশ্বাস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে একসময় আত্মবিশ্বাসও ভেঙ্গে যেতে পারে। হঠাৎ মাঝরাতে ট্রেনের টিটির উদয়। একটা টিকেট কম আছে। রাজন বলল- ভাবিস না, টিকেট করতে হবে না। আমি দেখ কি করি? তমাল অনুরোধ করল- আরে আমরা টিটির কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে টিকেট কেটে নেব। তুই কোন ওস্তাদি করার চেষ্টা করবি না। রাজন- দেখ, এটা আমারটাই মিস্। আমি দেখছি কি করা যায়, বলে চলে গেল। অন্য আরেকটা সীটে গিয়ে বসলো রাজন। টিটি টিকেট চাইলে বলল- আমরা তের জন বন্ধু একসাথে ভর্তি পরীক্ষা দিতে সিলেটে যাচ্ছি। এগারজনের টিকেট পেছনে বাম পাশে বসা বন্ধুদের কাছে আছে, আর দুইজনের সীট সামনের বগিতে পড়েছে। ওখানে আমি আর আমার এক মেয়ে বান্ধবি বসেছি। তার কাছে আপনি দু’টো টিকেট পাবেন। টিটি পরবর্তী যাত্রীদের টিকেট দেখার জন্য সামনে চলে গেল। রাজন উঠে যেয়ে টিটিকে পেছনে ফেলে সেই মেয়েটির কাছে গেল। বলল- ভাইয়া এখনো ঘুমুচ্ছে? একটু চোখে মুখে পানি দিলে ঘুমটা ভাঙ্গতো আর ফ্রেশ লাগতো। আমরা তো প্রায় এসেই পড়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তো নামতে হবে। হঠাৎ এমন কথায় মেয়েটি বেশ বিশ্বাস করলো যে ট্রেন হয়তো সিলেটের কাছাকাছিই চলে এসেছে। তাই বলল- ট্রেনের ওয়াশরুমগুলো সুবিধার কি না? -না না, অসুবিধা হবে না। এই দেখেন সামনের ওয়াশরুমটা বেশ পরিষ্কার। আমি ব্যবহার করলাম মাত্র। মেয়েটি তার হাজব্যান্ডকে ডেকে ওয়াশরুমে যাবার জন্য বলতেই টিটি এই কম্পার্টমেন্টে ঢুকে গেল। রাজন লোকটিকে ইশারায় ওয়াশরুম দেখিয়ে দিয়ে বন্ধুদের কাছে চলে এলো। টিটি এসে মেয়েটির কাছে টিকেট চাইলে দু’টো টিকেট বের করে দিল। মেয়েটির বয়স আর অবয়ব দেখে টিটির কাছে রাজনদের বন্ধুদের মতোই মনে হলো। তাই এগার আর দুই এই মিলে তেরজনের টিকেটের হিসেব সে মেলালো। কিছু সাধারণ বিশ্বাস যা মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে তা থেকে বের হবার একটাই উপায়, তা হচ্ছে গানের মতো করে বলতে হয়- মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন/মানুষ ধরো মানুষ ভজ/শোন বলিরে পাগল মন। যে বিশ্বাস দিয়ে নিজে ভুল করেছে সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অন্য ধাঁধাঁয় ফেলে নিজের অপরাধ আরো বাড়িয়েছে রাজন। মানুষের এই সরল বিশ্বাসগুলোকে আমরাই কেন অপপূঁজি করে, বোকা বানিয়ে মানুষকে ছোট করছি?
আমি তো দিব্য সরল, অমলিন চক্ষে দিব্য সকাল
করো না নষ্ট সব, ভেঙ্গো না ভাবনা হতে পরিপুষ্ট, বলো না মাকাল।
এ চোখে একটাই ছবি, যা অলোকময় পরিষ্কার,
বিভেদে, ধাঁধাঁয়, অস্পষ্টতায় ফেলবে না তোমায় বার বার!

একই অঙ্গে কত রূপ! নিশি তমালের এক গানের ছাত্রী, সাংস্কৃতিক বা অ্যাকাডেমিক এমন কোন অনুষ্ঠান বা কার্যক্রম নেই যেখানে তাকে দেখা যায় না। নিঃসন্দেহে এটা চমৎকার। মাল্টিটেলেন্টেড এরা। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো যখন চরিত্রে স্থায়ীভাবে বসে যায়, বা বিভিন্ন অঙ্গের এই বহুরূপী রঙ যখন আর শুধুমাত্র বাহ্যিক চরিত্রে না থেকে অভ্যন্তরটাকে পরবির্তিত করে তখন সমস্যাটা প্রকট হয়। যত রকমের মাল্টিটেলেন্টেডই হোন না কেন প্রতিটি মানুষেরই কিছু মৌলিক বিষয়ে একদম একমতেই থাকতে হবে। যা সার্বজনীন, শুদ্ধ। এর কোন বিকল্প কখনো সুস্থ, বিবেকবান মানুষের থাকবে না। বান্ধবি তপাও তেমনি টেলেন্টেটেড ছিল। ভেতরকার ভিতটা মনে হয় শক্ত ছিল না, তাই অল্প বয়সেই প্রেম, প্রত্যাখ্যান, বিচ্ছেদ-বিরহ, আবার স্বপ্ন দেখা আবার ভেঙ্গে পড়া। অবশেষে অনুধাবন, ততদিনে সবশেষ। সম্ভাবনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে অস্থির সময়ের স্রোতে নিঃশেষ হলো।

এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল তমালের সাথে থাকা একবন্ধু। পরিচয় পর্ব ও কথার পর বন্ধুটি জানালো খুব সিরিয়াস লোক এই বড় ভাই। মানুষ খুন করে হাসপাতালে যেয়ে সেই খুনীর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে নিজের সহমর্মিতা জানাতে অভিনয়ের জুড়ি নেই তার। এতো সূক্ষ্মভাবে সবকিছু ম্যানেজ করেন যে, কেউ তাকে কোনভাবেই কালপ্রিট প্রমাণ করতে পারবে না। কি নারী কেলেঙ্কারী, কি টেন্ডারবাজী, কি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবসা, কি চোরাকারবারী, কি পেশী শক্তির অপব্যবহার, কি সিন্ডিকেট করা, এমন কোন কাজ নেই যেখানে তার চলাচল নেই। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখলে সুদর্শন, সুপুরুষ, সুকত্থ, সুকণ্ঠ, সুআলোচক, যৌক্তিক, মার্জিত মনে হবে। বেশ কিছুদিন তার সাথে তমালের যোগাযোগ ঘটে। তার চোখ দু’টো আর আচরণ কখনো এমন অবিশ্বাস দেখাতে পারেনি। তমালের কাছে মনে হয়েছে বন্ধুর কথা বুঝি মিথ্যে। রাজনীতি, সংগঠন আর ব্যবসার খাতিরে এই বড় ভাইয়ের সাথে সময়গুলো চলছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আসল রূপ প্রকাশ পেল তখন, যখন তার বলয়ের লোকদের স্বার্থ একটু স্খলিত হলো। বড়ভাইয়ের সাথে থাকা এই লোকেদের স্বার্থ এবং তার স্বার্থ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকলো তার কুৎসিত আচরণ। অতো সুন্দর একটি মানুষের মধ্যে এমন আচরণ বা কর্মকান্ড লুকিয়ে আছে যা ভাবাই যায় না।

একজন মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে তার আচরণ, বাহ্যিক কাজ-কর্ম দেখে তখন বিশ্বাসী মানুষটির দায়িত্ব বেড়ে যায়। অনেক অপরাধ ভেতরে লুকানো থাকলেও, এই বিশ্বাসী হয়ে ওঠার কারণেই অবিশ্বাসগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে। মানুষ হয়ে ওঠার জন্য, বিশ্বাসী হয়ে ওঠার জন্য আমাদের প্রতিযোগিতা করা উচিৎ। অবিশ্বাসী হবার ঘৃণিত রূপ এমন- যে মানুষটি বিশ্বাস করে আপনাকে বিশ্বাসী মনে করলো, সেই মানুষটির বিশ্বাসের মূল্য দেবার যোগ্যতাই আপনার নেই। আমাদের সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, লেখক, কবি, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি আরো কতশত নামীদামী পেশাদারী লোক আছেন, দরকার এর পাশাপাশি একেকজন ভাল মানুষের, সৎ মানুষের, বিশ্বাসী মানুষের। শত আদর, যতœ, সেবা আর ভালবাসা দিলেও যে কোন মুহূর্তে পশু যেমন তার পাশবিক আচরণ প্রকাশ করতে পারে মুনিবের প্রতি, হয়ে উঠতে পারে স্ববৈশিষ্ট্যে পশু, ঠিক তেমনি একজন অন্যায়কারী, অসৎ মানুষ সমাজের জন্য, বিশ্বের জন্য ভয়ংকর।

মনের গহীনে আজি স্বপ্ন আঁকি, তুলিতে আঁকবো স্বপ্ন বিশ্ব;
যা আছে নিজের ভাল, বিলাব সব, হবো দাতা, তুলে ধরবো রিক্তেরে, নিজে হবো নিঃস্ব!
আপন আলোয় আলোকিত হবে ধরা;
জরা, পঁচা, অস্পৃশ্য হবে জড়, ভংগুর, মরা!
সুচিন্তার এ আলো ছড়াবেই একদিন, হবে স্বর্গ এ মর্ত;
থাকবে না পাপ, সুলব্ধ হবে বেহেশ্ত, লাগবে না কোন শর্ত!

-এস জে রতন
সংগীতশিল্পী, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকমী
sjratan@gmail.com
পাতাটি ৩৪৭৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন



– এস জে রতন

ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো
কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো।

হ্যালো, কথা বুঝতে পারছি না ভাল
একটু জায়গা চেঞ্জ করো, হেলো না হয় দোলো।

তবে নেটওয়ার্ক পাবে ভালো, স্পষ্ট হবে কথা
ওহ্! লাইনটাই কেটে গেলো, লাগলো মনে ব্যথা!

২০০১ সালের কথা। শখ করে টিউশনীর টাকা জমিয়ে একটা গ্রামীণফোন সিমসহ নকিয়া সেট কিনল তমাল। তমালের বাবা ছেলের এমন ভাবে সঞ্চয় করে কোনকিছু কেনার বিষয়ে বেশ খুশি হল। অন্তত ঘরের জমানো টাকা ব্যবহার না করে নিজের যোগ্যতায় কিছু করাটা বেশ ভাল চোখে দেখলো। তমাল তার এই মনের বাসনার কথা মোবাইল কেনার আগে কখনো কাউকে জানায়নি। তবে খুব ইচ্ছে ছিল কি করে একটা মোবাইল কেনা যায়। বাবা স্বউদ্যোগী হয়ে মোবাইলের জন্য দামী একটা মোবাইল কাভার কিনে দিলেন। বললেন- তোর কাজে খুশি হয়ে এটা আমার টাকা থেকে তোকে কিনে দিলাম। পরিবারের সবার মধ্যে এই একটাই মোবাইল ফোন তখন। পরিবারের লোকজন তো বটেই, পাড়া পড়শি অন্যান্যরাও তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য এই তমালের সেল নাম্বারই দিতে শুরু করল। কতজন কত রকমের কথা বলার জন্য কতজনকে যে চায়, তা আর বলার অপেক্ষাই যেন রাখে না। এমন কিছু কলও আসতো যার জন্য মধ্যরাতে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে, এক কিলোমিটার হেঁটে চিৎকার করে ডেকে তারপর কথা বলার জন্য মোবাইল এগিয়ে দিতে হত। তমালের কল খুব কমই আসতো। কারণ তখন তমাল সবেমাত্র পড়া শেষ করে নতুন একটি চাকরিতে যোগদান করেছে। গ্রামে থাকলে ঘরের বাইরের আঙ্গিনায় যেখানে খোলা মাঠের সবুজ দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে যায় সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। ঘরের মধ্যে নেটওয়ার্ক কখনো পাওয়া যেত কখনো পাওয়া যেত না। তবে রাত্রে নেটওয়ার্ক থাকত। মোবাইল স্ক্রীনে ভেসে থাকা নেটওয়ার্কের পাঁচটি বারের মধ্যে এক আর দুইয়ের মধ্যে থাকত। দুর্বল নেটওয়ার্ক। তবে কথা বলা যেত। কখনো কখনো এমন হত সারাদিনে বাড়ির খোলা আঙ্গিনার কাছে গেলেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না বা ধরা যেত না। তখন বাড়ির সামনের পুকুরের কাছে গেলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। পানির সাথে নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়। পানির অপর নাম জীবন। ঠিক তেমনি জীবনের সাথেও নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে। জীবন থাকলেই নেটওয়ার্ক থাকে আর জীবন নেই তো নেটওয়ার্ক নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক কবি ভদ্রলোক তার জরুরী এক দরকারে তমালের নানার সাথে দেখা করার জন্য অনেক পথ মাড়িয়ে, ভ্রমণে অনেক কষ্ট সহ্য করে জামালপুরে এসে কবি বন্ধুর বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। নানা কবির সাথে এই কবি ভদ্রলোকের কোন একসময় বেশ বন্ধুত্ব ছিল। সে অনেক বছর আগের কথা। দুই বন্ধু তখন একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কালের পরিক্রমায় যোগাযোগটা এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের প্রায় শেষ সময়ে এসে এই কবি ভদ্রলোকটির মনে পড়ে যায় তমালের নানার কথা। সে সময়ে হাতে গোনা কিছু পত্রিকা আর মিডিয়া ছিল। যে কারণে কোনভাবে যোগাযোগ আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। একে অপরের কিছু কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপি এই দুই বন্ধুর কাছেই ছিল। বিশেষ প্রয়োজনেই এগুলো এখন বাংলাদেশ সরকারের এক ট্রাস্টিতে সংরক্ষণ করতে চাইছেন এই কবি ভদ্রলোক। যেগুলো নাকি যুগের পর যুগ আর্কাইভে থাকবে আর নতুন নতুন কবিরা এই লেখাগুলো নিয়ে গবেষণা করবে। যখন জানানো হল উনি আর বেঁচে নেই, তখন প্রায় অজ্ঞান হবার মত অবস্থা হলো অতিথি কবির। কাঁদতে কাঁদতে বললেন- উনার কাছে কবিতা সাহিত্যের অনেক মূল্যবান সম্পদ ছিল, যা শুনে বা জেনে লিখে রাখা যেত। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আউট অব নেটওয়ার্ক হলে যা হয় তাই হল। যদি এই দুই বন্ধুর মাঝে কোন না কোনভাবে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হত তাহলে হয়তো এমনটা হত না। ভদ্রলোক এই বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই তার পরিচিত আরো কিছু কবি বন্ধুর নাম ও ঠিকানা মনে করে তালিকা করে লেখার চেষ্টা করল, যাতে এই ধরনের ভুল আর না হয়। আমরা মানুষ, এমন ধরনের যে যখন আমাদের কাছে রতœ মাণিক্য থাকে তখন তার গুরুত্ব অনুধাবন করি না। আবার যখন কাছে না থাকে বা কোনভাবেই আর তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না, তখন ব্যতি-ব্যস্ত হই, আফসোস করি আহা কি হারিয়েছি! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবদ্দশায় দুঃখ করে বলেছিলেন- বাংলা সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে আমি কি দিয়েছি জানি না, তবে আমার গানে আমি যা দিয়েছি তা আমার মৃত্যুর পর মানুষ উপলব্ধি করবে।

একটু খানি ছিল তোমার পূঁজি
তাতেই একটু আমার প্রেম বুঝি;

একটু ভাললাগা বাড়লো বড়
তবে নেটওয়ার্কটা তুমিই শক্ত করো;

এভাবেই শুরু, আর শেষটা যেন না হয়
তোমার আমার এই নেটওয়ার্কটা আজীবন যেন রয়।

স্কুল জীবন থেকে ভাললাগা। নরম স্বভাবের নীলিমা মেধাবী বাদলের সবকিছুতেই যেন আকর্ষণ অনুভব করে। পড়া সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে প্রায়ই সাহায্য নিত নীলিমা। পাশের গ্রামে এক চয়োরম্যানের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করত বাদল। বাদলদের বাড়ি খুলনায়। ময়মনসিংহে এসে নীলিমাদের স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। নবম শ্রেণীতে প্রথম হয়েই সবার নজরে আসে বাদল। স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, পাড়া-পড়শি, বন্ধু-বান্ধবি সবাই খুব আদর, স্নেহ আর সমীহ করে। স্কুল থেকে ফেরার সময় একসাথে হেঁটে বাড়ি যেত নীলিমা বাদলসহ চার পাঁচজন বন্ধু। একদিন নীলিমা হঠাৎ মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যায়। অন্য বন্ধুরা নীলিমার বাবাকে খবর দেবে বলে চলে গেলে বাদল সেখানেই নীলিমার পাশে ছিল। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে বন্ধুদের কেউ বা নীলিমার বাবা বা কোন আত্মীয়-স্বজন যখন এগিয়ে আসতে দেখা গেল না, তখন বাদল নীলিমাকে দুইহাতে ধরে তুলে নিয়ে ঘাসে শুইয়ে দেয়। নীলিমা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকে। মেঠো পথ, কাছে কোলে কোন বাড়ি না থাকায় নীলিমাকে জাগিয়ে ধীরে ধীরে কাছের এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে বাদল। কিন্তু নীলিমাকে তো জাগিয়ে তুলতে হবে। পাশের এক নিচু জলাশয় থেকে হাতের পাঞ্জায় করে পানি এনে নীলিমার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দেয়। নীলিমা জেগে উঠলে বাদলের কাঁধে ভর দিয়ে নীলিমাকে পাশের এক বাড়িতে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই বাদলের প্রতি টান অনুভব করতে থাকে নীলিমা। শুচি শুদ্ধ এক পবিত্র প্রেমের উপক্রমণিকা যেন। প্রয়োজন আর লেখাপড়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের কারণে যোগাযোগে কিছুটা হলেও ছেদ পড়ে নীলিমা আর বাদলের মধ্যে। ভিন্ন কলেজে ভর্তি হওয়া, ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, জীবন নিয়ে ভাবা, চাকরীর সন্ধান, বিভিন্ন বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে। অনেকগুলো সময় পেরিয়ে যায়। মোবাইলে কথা হত সবসময়। হঠাৎ বাদলের মোবাইল বন্ধ। নীলিমা খুলনায় বাদলের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেবার প্রয়োজন কখনো অনুভব করেনি। কারণ মোবাইলেই সবসময় কথা হত। আর সম্পর্কটা চলছিল অনেক ভদ্রোচিতভাবে, তাই হয়তো অতোটা খোলামেলা হয়ে সবকিছু জেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় নয় বছরের সম্পর্ক হঠাৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হবার কারণে শেষ হয়ে যাবে, এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল নীলিমার। নীলিমা ভাবছিল- আমি না হয় তার বাড়ি চিনিনা কিন্তু চাইলে সে তো ময়মনসিংহে আসতে পারে। আমার বাড়ি, ঠিকানা সবকিছু চেনে সে। কোন কারণও খুঁজে পাচ্ছেনা। কেন হঠাৎ এমন হবে? বাদলের তো নীলিমার নাম্বার জানাই আছে, তাহলে যে কোন ভাবে কথা বলা সম্ভব। এমন তো হবার কথা না? কিন্তু এমন হল। এতো আলাপ হতো তাদের দু’জনের মাঝে, কত গুরুত্বহীন কথায় দিনের পর দিন, সময়ের পর সময় পার করেছে এই দু’জনে। অথচ কত কিছুই না অজানা থেকেছে? সারা জীবনে মানুষ এভাবেই বোধ হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সময় পার করে। মনের সাথে অনেক বোঝা পড়া করে একসময় খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় নীলিমা। বাদলের সাথে কথা বলার সময়, খুলনায় তাদের বাড়ি, স্কুল সেখানকার আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন বিষয় জানিয়েছিল, সেই কথাগুলো মনে করে, অনেক কষ্টে নীলিমা ঠিকই বাদলের বাড়ি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সড়ক পথে দুর্ঘটনায় বাদল মারা যাবার সময় কেউ নীলিমাকে এই খবর জানাতে পারেনি। বাদলের নাম্বারও সেসময় থেকেই বন্ধ। বাদল এখন আউট অব নেটওয়ার্ক। কোন নেটওয়ার্কেই তাকে আর ধরা যাবে না। এখন নীলিমার সংসার আছে। সন্তান আছে। স্বামী সন্তানকে সারাক্ষণ নজরে নজরে রাখে। এদের প্রতিটি কথা আর মুহূর্তকে গুরুত্ব দেয়।

চাকরির প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ করাতে পার্বত্য এলাকায় গিয়েছেন তমাল। রাঙ্গামাটির এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ চলছে। বছর দশেক আগের কথা। এই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই সমস্যা করত। নেটওয়ার্ক পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। ঘুরতে ঘুরতে কোন স্থানে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলেও বেলা বাড়া বা কমার সাথে সাথে নেটওয়ার্কের সবলতা দুর্বলতার পার্থক্য ঘটত। সন্ধ্যা বা গভীর রাত বা খুব ভোরে নেটওয়ার্ক কিছুটা পাওয়া যেত। তমাল ঢাকার সাথে, পরিবারের সাথে ঐ সময়গুলো খেয়াল রেখেই কথা বলত। প্রশিক্ষণ সময়ের শেষে একদিন বিকেলে অংশগ্রহণকারী এবং তমাল মিলে কর্ণফুলী নদীতে ঘোরা এবং সুবলং ঝর্ণা দেখবে বলে নৌকা ভাড়া করল। সাধারণত যেটা হয়, যেকোন জমায়েতেই দেখা যায় প্রায়ই জমায়েত দু’টো ভাগে ভাগ হয়। একটি হচ্ছে মোটামুটি তরুণ বা কম বয়েসীদের দল অন্যটি হচ্ছে এই বয়সের চেয়ে একটু বেশি বয়সের কিছুজনের আরেকটি দল। নৌকা চলতে চলতে একটি ঘাটে থামাল। কেমন করে যেন ঘুরতে ঘুরতেই দু’টো দলে ভাগ হয়ে গেল পুরো মূলদলটি। দু’টো মেয়ে অংশগ্রহণকারী তারাও ঐ তুলনামূলক তরুণের দলেই দলভুক্ত হলো। প্রশিক্ষকসহ চব্বিশ জনের মধ্যে চৌদ্দজন তমালদের সাথে বাকি দশজন লাপাত্তা। এই তো এখানেই ছিল, সবার একসাথেই তো থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাকিরা কোথায় গেল? -এক অংশগ্রহণকারী বলছিলেন। একজন তো মজা করে বলেই ফেললেন- ভাই আমাদের দলের ট্রেইনার স্যারও তো তরুণ, তাকে বয়ষ্কদের দলে দিয়ে বাকিরা কিভাবে দল গঠন করল? এ ভারি অন্যায়, কালকের ক্লাসে এটা নিয়ে ঐ গ্র“পের জরিমানা ধরা হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসলো প্রায়। এর মধ্যে ঐ দলের কারো সাথে কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পুত পুত শব্দ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। যার যার কাছেই মোবাইল ছিল, হাতে নিয়ে দেখা গেল মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। একজন বলে উঠলেন- ঐ দলে তো রাঙ্গামাটির স্থানীয় কেউ নেই। সন্ধ্যার পর এখানে অপরাধের মেলা বসে, কিছু একটা হয়ে গেলে কি অবস্থা হবে তাদের? তমালের খুব দুশ্চিন্তা হল। সর্বোপরি সে এই পুরো দলের লিডার, প্রশিক্ষক। যদি সে তাদের সাথে না থাকত বা এই ঘোরাফেরার অনুমোদন না দিত তবে হয়ত দায় থেকে মুক্ত থাকা যৌক্তিক হত। তিন্তু এখন তো সে উপায় নেই। এই তাগড়া তাগড়া যুবক আর মধ্যবয়ষ্ক লোকগুলোকে নিয়ে তার এমন বিপদে পড়তে হবে ভাবতেই যেন পারছিল না।

এদিকে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে, অন্ধকার জেঁকে বসছে। সন্ধ্যা হওয়ায় মোবাইলের স্ক্রীনে নেটওয়ার্ক বার এক-দুই করে আপ-ডাউন করতে দেখা গেল। তমাল বলল- আপনাদের কারো কাছে ঐ দলের কারো নাম্বার আছে? তমালদের দলের একজনকে পাওয়া গেল যে ঐ দলের কোন একজনের সাথে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একই কক্ষে থাকে। তার কাছে তার রুমমেটের মোবাইল নম্বর আছে কি না জানতে চাওয়া হলে বলল- একসাথে থাকতে গিয়ে অনেক কথাই তো হয়েছে এই এগার দিনে কিন্তু কেন যেন মোবাইল নম্বরটা নেয়া হয়নি, ভেবেছি শেষ দিনে নেব। তমালের প্রায় রাগই হচ্ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে বললেন- হ্যাঁ শেষ দিনেই তো নেবেন! শেষ দিনে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে, ভাই আমার বাসের সময় হয়ে গেছে, বেরোচ্ছি, পরে দেখা হলে মোবাইল নম্বরটা নিতে পারবো, পরে যেকোন ট্রেনিং-এ আবার দেখা হবে, তখন বিস্তারিত আলাপ হবে। বার দিনেই আসল তথ্যগুলো শেয়ারিং-এর সুযোগ হল না, আবার কি না কোন অনিশ্চিত কালে দেখা হলে তখন মোবাইল, ঠিকানা ইত্যাদি নেয়া হবে। এটাই করি আমরা। যখন আউট অব নেটওয়ার্ক হই, তখই গুরুত্ব বুঝতে পারি কি ভুলটা হলো। এবার ঐ দলের একজনের নাম্বার এখানকার একজনের কাছে থাকায় সে কল দেবার চেষ্টা করে কিন্তু এখানে নেটওয়ার্ক থাকলেও ঐ অংশগ্রহণকারী হয়তো আউট অব নেটওয়ার্ক তাই বেরসিক নারী কণ্ঠ বলে উঠল- এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কল করে আরো কিছু অংশগ্রহণকারীর মোবাইল নাম্বার নিয়ে কল করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল, কারণ ঐ দলটি যেখানে আছে সেখানে হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা দশজনকে ছাড়াই দ্রুত কর্ণফুলী নদীর জল চিরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হল তমালরা। এবার অপেক্ষা করা কখন আল্লাহ্র দয়া হয় আর বাকি চৌদ্দজন কেন্দ্রে আসেন। রাত বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে সবাইকে অক্ষত পাওয়া গিয়েছিল বটে। তবে শিক্ষা হয়েছিল প্রচন্ড যে আলোচনা, পরিকল্পনা, শেয়ারিং, যোগাযোগ আর নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকার মধ্যে গুরুত্ব কত।

নষ্ট তুমি হয়েছ বেশ, এবার একটু থামো
গভীর জলের ঢেউ দেখেছ, এবার একটু নামো;

সাঁতার জেনে উঠলে কূলে, ভাবলে বেঁচে গেলে
কুমির তো জলেই আছে, ডাঙ্গার বাঘ দেখে ভয় পেলে?

সময়টাকে বেশ বোঝো তো, বানাও টাকা কড়ি
নিঃস্ব হওয়ার ক্ষণগুলো তো অপেক্ষায় পেতে আড়ি।

প্রতিটি উদ্ভাবনের বা আবিষ্কারেরই ভাল দিক আছে। আবার চাইলে এই ভাল দিকগুলোকে মন্দভাবেও ব্যবহার করা যায়। নেটওয়ার্কের মধ্যে থেকে এর ভাল ব্যবহারই সবার কাম্য। কিন্তু সবাই যদি অতো ভালই হতো তবে তো স্বর্গ এই বিশ্বই হতো। বাবার তিন তিনটা ছেলের মধ্যে এই ছেলেটি বেশ দুষ্ট। এখন তো আবার দুষ্ট বলতে মিষ্টি বোঝানো হয়। আসলে দুষ্ট বলতে খারাপ, নষ্ট। ছেলের নেটওয়াকিং ক্ষমতা যথেষ্ট চরম। কিন্তু ছেলে সম্পর্কে বাবার নেটওয়াকিং ছিল যথেষ্ট নরম। তাই ছেলে হাইস্কুল পার হতে না হতেই বড়দের সবকাজে অভ্যস্ত। অকালপক্ক যাকে বলে। আঠার বছর আগে প্রায় সবগুলো পত্রিকায় একটি খবর রেবিয়েছিল, আমেরিকার এক বার বয়েসী ছেলে শিশু কোন এক নামকরা কোম্পানীর সিইও হয়েছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা আর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা করার ক্ষমতা এত প্রখর ছিল যে স্কুলের শিক্ষকম-লী আর বোর্ড তাকে স্বপ্নদিনেই একের পর এক সার্টিফিকেট দিয়ে তার সমস্ত অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকা-, পরিকল্পনা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সে এত পারদর্শী ছিল যে, এত ছোট একটি শিশুকে অফিসের বিভিন্ন বয়েসী আর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সমস্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ তার নির্দেশনায় চলত। সুনামও কুড়িয়েছিল বেশ, তাইতো বিশ্ব সংবাদে তাকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল তখন। এই দুষ্ট ছেলেটি ঠিক তার উল্টো। বাবা, মা সংসার চাকরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দু’টো ছেলে নিজ দায়িত্বেই মোটামুটি বড় হচ্ছিল। তৃতীয় এই ছেলেটি যাচ্ছে তাই। খারাপ বন্ধুদের সাথে বেশি মিশত। লেখাপড়ায় মনোযোগ কখনোই ছিল না। ভাল কাজের স্বীকৃতির মধ্যে আত্মার যে শান্তি নিহিত তা তাকে কখনো কেউ বোঝায়নি বা বোঝানোর চেষ্টা করেনি। একদিন এই ছেলেটি অনেক বড়লোক হল। শহরে, মহল্লায়, গ্রামে, পাড়ায়, পার্টিতে তার বেশ প্রভাব। নামকরাও বেশ। সবাই চেনে। সামনে দামও দেয়। অনেক লোকের কাছ থেকে যেমন চাঁদা নেয় তেমনি অনেক লোককে আবার পোষেও বটে। তাই দৃশ্যত তার কোন শত্র“ নেই বরং ভক্ত আছেন প্রচুর। ক্ষমতা আর দাপট দেখানো এবং নিজস্ব অন্যায় ব্যবসাগুলোকে ঠিকভাবে চালিয়ে নেবার জন্য বিশেষ বিশেষ দলবাজিও করেন। এখন বাবা-মা তাকে নিয়ে বেশ নিশ্চিন্তা। বাকি দুই ছেলে চাকরি করছেন, কোনমতে সংসারটাকে চালিয়ে নিচ্ছেন। কোন ঋণ নেই কারো কাছে। নিপাট ভদ্রলোক এরা। কাউকে বড় পরিসরে সাহায্যও করতে পারেন না, আবার কারো ক্ষতির কোন কারণও হন না। সমাজের চোখে সাদামাটা, সাধারণ, নিম্ন মধ্যবিত্ত।

জ্ঞানীদের চোখে এই দুইভাই-ই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় ধনী ও সুখি। অন্যায় উপার্জন আর নৈতিকতা বর্জিত ক্ষণকালের ক্ষমতা দিয়ে হয়তো কিছু যুগ দাপটের সাথে বসবাস করা যায়। নেটওয়ার্কের সবচেয়ে চূড়ায় অবস্থান করা যায় কিন্তু আউট অব নেটওয়ার্ক হলে তখন? নেটওয়ার্ক বলতেই আমরা বুঝি অন্তত দু’টি বা বহু মাধ্যমে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়া। কিন্তু একপক্ষীয় নেটওয়ার্কও হতে পারে। তখন সেই নেটওয়ার্কের একপক্ষ শুধু তথ্য দিয়ে যাবে আর অপরপক্ষ শুধু তথ্য পেতে থাকবে কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর করতে পারবে না। মৃত্যুর পর মানুষের তা-ই হয়। প্রায় সবকিছুই আমরা খুব সাধারণ চোখে দেখে থাকি। জ্ঞানী হতে হলে অসাধারণ চোখে দেখতে হবে। বিভিন্ন পর্যায় বা পক্ষ থেকে দেখতে হবে। তবেই বোঝা যাবে আসল রহস্য। একটা খুব জনপ্রিয় কৌতুক আছে- শিক্ষক ক্লাসের দুষ্ট ছেলেটাকে পড়ায় মনোযোগ ফিরিয়ে আানার জন্য প্রশ্ন করলেন- আবির, বলতো, তোমার একপাশে যদি জ্ঞান রাখা হয় আর অন্যপাশে যদি টাকা রাখা হয়, তবে তুমি কোনটি বেছে নেবে? আবিরের চটপট উত্তর- কেন স্যার? খুব সহজ, আমি টাকাই নেব। শিক্ষক বললেন- আমি হলে জ্ঞান নিতাম। আবির সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাথে সাথে বলে উঠল- স্যার, যার যেটা অভাব! তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এই ধরনের ছাত্র টাকাকে চিনবে না কি যে শিক্ষক বা যারা এই শিক্ষকের অনুসারী তারা বড়লোক হবে? অর্থের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক খুবই কম। জ্ঞানকে অর্থের মূল্যে কখনোই মাপা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানীরাই সুখি হয়, স্বর্গ পায়। এই নেটওয়ার্কের যেকোন প্রান্তই সচল থাকুক না কেন তা উপকারেই দেয়। মধ্যিখানের মিডিয়া হন স্বয়ং আল্লাহ্ই।

বৃক্ষের পরিচয় ফলেই। আবার একটা বৃক্ষ রোপন করলে যেমন বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার ফল পেতে থাকার ব্যাপারটি থাকে, তেমনি পৃথিবীর সময় তো সময়ের শেষ পর্যায় নয়, ইহ-পরের মহাকালের ক্ষণিক অংশ মাত্র, তাই সুসন্তান, সুবংশধর বা সুকর্ম বা সুবিনিয়োগ থেকেও অনন্তকাল পর্যন্ত এর ভাল ফলাফল পাবার সুযোগ থাকে। তখন নেটওয়ার্ক মৃতব্যক্তির দিক থেকে একপক্ষীয়ভাবে বলবৎ থাকে। মৃতব্যক্তির কিচ্ছু করার থাকে না কিন্তু যা করে ফল পাবার ব্যাপারটি ছিল, তা থেকে ফল পেতে থাকেন। যদি ভাল কিছু করেন তো ভাল কিছুই পাবেন আর খারাপ বা মন্দ কিছু করে থাকলে মন্দই পেতে থাকবেন। দুনিয়ার দিক থেকে সকল নেটওয়ার্কের বাইরে থেকেও কিভাবে জীবন্ত মানুষগুলো মৃতব্যক্তিদেরকে, বিশেষ করে বাবা-মাকে সুখী বা অসুখী রাখছেন তা সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে যেমন সকাল দেখি তেমনি একদিন ষাট/সত্তর/আশি/নব্বই বছর পর একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে মনে হবে- এতোগুলো সময় পেরিয়ে গেল? বুঝলামই না? আজ দেহের সেই টগবগে জৌলুস নেই, মনের সেই কামনা নেই-থাকলেও উপায় নেই, শত রোগে আর জরায় ক্লান্ত এ দেহটি নুয়ে ভেঙ্গে পড়ার অপক্ষোয়। মনে হবে সারাটা জীবন এতো এতো নেটওয়ার্কে থেকে প্রকৃত অর্থে কি উপকার করতে পেরেছি পৃথিবীর বা নিজের? অথচ আউট অব নেটওয়ার্কে যাবার আগে এখন বুঝতে পারছি- সব খেলা ছিল, শুধুই খেলা। তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া/ কি হবে আর কান্দিয়া…/নকল হাটে আসল সোনা গেলাম বেচিয়া…।

লহো তারে বিনাশী, উগ্র বড় মত্ত রহে এ মম
বিলায়ে সবই, খোঁজো রবি, ভাঙ্গো মোর ভ্রম;

শুদ্ধ বিচারি, মগ্ন ধ্যানে করো মর্ম বিদারি
মহাকল্য পটে অবিকল্য করো তিমির বিদূরি।

লেখক: এস জে রতন
কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী।
পাতাটি ৩৭৯০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই



– এস জে রতন
মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে …
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে।
বাসের পাশের সীটে বসা এক সহযাত্রী হঠাৎ কথা বলে উঠলেন- ভাই, আপনি কি মিডিয়া বা পাবলিক রিলেশন টাইপের কোন কাজের সাথে জড়িত? -কেন? তড়িৎ প্রশ্ন তমালের। -না মানে, কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনাকে এই প্রশ্নটি করা যায়। আপনি নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না, তাই করলাম। -কেন? আমাকে দেখেই আপনার বিশ্বস্ত কেউ মনে হলো? -হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। আপনার মধ্যে একটা সরলতা আছে। -সরলতা মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে? -সবসময় না, তবে বোঝা তো যায়। চটকদার এই মিসডিজিটাল যুগে কারো সরলতা যে যেকোন মুহুর্তে অভিনয় হতে পারে, যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারে তা পাঠকগণ নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করবেন। কিন্তু তাই বলে কি সরলতা বা সারল্য বা সরল এই কথাগুলোকে একদমই বিশ্বাস করবো না? যা কিছু ঠিক তা ঠিকই। আর যা ঠিক নয় তা বজর্নীয় বা পরিত্যাজ্য। তবে চৌকস থাকাটা নিশ্চয়ই ঠিক। না, লোকটির কোন বাজে উদ্দেশ্য ছিল না। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরখ করে, ঐ সহযাত্রীর সবটুকু আচরণ, আচরণের ক্ষণিক ত্র“টি বা বিচ্যুতি বা মুভমেন্ট, অঙ্গভঙ্গি সব অবলোকন করে যা বোঝা গেল তা হলো, সত্যি লোকটির মনস্তত্ত্বে ছাপ ফেলেছে তমালের সাধারণ জেশ্চার-পোশ্চার, কথাবলা, চাহনী, কন্ডাক্টরের সাথে ভাড়ার লেনাদেনা সবকিছু। লোকটির গন্তব্যে বাস পৌঁছে যাওযায় নেমে গেল সে। যাবার সময় ভিজিটিং কার্ডটা চেয়ে নিল। তমাল ভাবছিল, লোকটি তার মধ্যে কি দেখল যে এমনি এমনিতেই ভক্ত হয়ে গেল? বগুড়ার বেতগাড়ির এক অফিসে সন্ধ্যায় পৌঁছল তমাল। লাগেজটা গেস্টরুমে রাখতে না রাখতেই ঘন্টা কয়েক আগের সহযাত্রীর মোবাইল কল- ভাই, ভালভাবে পৌঁছতে পেরেছেন? বাকি পথে কোন সমস্যা হয়নি তো? ভদ্রতা করে তমাল বলল- আপনার বাড়িতে সবাই ভাল আছেন তো? -হ্যাঁ, ভাল আছে। আর আপনার কথা আমার ওয়াইফের সাথে বলেছি। -হায় হায়, কি বলেছেন? আমার আর আপনার মাঝে এমন কিছুই হয়নি যা গল্প করে বলা যায়। -না, তবে কেন যেন আপনার গল্প করা যায়।
চর। ধু ধু বালু আর বালুকারাজি। কাশবনের সাদা সাদা ফুলগুলো দেখতে ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বহ্মপুত্রের তীর ধরে হাঁটছিল তরুণ কয়েকজন শিক্ষার্থী। বহ্মপুত্রের বরপুত্র আর নেই, সে এখন -এই খানে এক নদী ছিল জানলো না তো কেউ, আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ… টাইপের হয়ে গেছে। অর্থাৎ নদীই ইতিহাস আর নদ তো দূরের কথা। বালুচরের আড্ডায় সেখানকার এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী অন্ধভক্ত হয়ে গেল তমালের। আড্ডাতে সবাই গান করেছে, কৌতুক করেছে, রস আলোচনা করেছে কিন্তু এরই মধ্যে কেউ না কেউ যে অনন্য হয়, শহীদুল্লাহর আগ্রহটাই যেন তা প্রমাণ করে দিল। অনেকের মনের কথা অনেকেই বলতে পারে না, কিছুজন বা কেউ একজন বলে। বাকিরা সায় দেয় মৌনতায় বা অঙ্গভঙ্গিতে। কিছুদিন পর শহীদুল্লাহ দুইজন বন্ধু নিয়ে হাজির বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। তমালকে তাদের সাথে চরের এক অনুষ্ঠানে যেতে হবে। সেখানে শুধু তমালকে উদ্দেশ্য করেই গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার অন্যান্য বাউল শিল্পীরাও থাকবেন সেখানে। চরের সহজ, সাধারণ আর সরল মনের মানুষগুলোকে গান শুনিয়ে সুনামের বিস্তৃতি কতটা বাড়ানো যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এদের হৃদয়ের সবচেয়ে আবেগঘন জায়গায় ঠাঁই করে নেয়া যাবে আজীবনের জন্য তা অনুমান করা গেল। নির্দিষ্ট দিনে চরের অজোপাড়ায় আমন্ত্রিত হয়ে হাজার মানুষের সামনে তবলা-হারমোনিয়াম আর স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত বেহালায় চলতে থাকলো লালন, হাছন, নজরুল, মারফতি, মুর্শিদী, আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন, মান্নাদেসহ আরো কত রকমের পুরোনো দিনের গান। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, তারপর ভোর অবধি তমালসহ স্থানীয় অন্যান্য শিল্পীরা মিলে প্রায় শতাধিক গান গীত হলো অনুষ্ঠানে। গানের ফাঁকে চা, দর্শকদের সাথে আড্ডা, কথা বলা, অনুরোধের গান গাওয়া, দর্শকদেরকে সাথে নিয়ে গান গাওয়া, মঞ্চে দর্শকদেরকে সুযোগ দেয়া কত কিছুই না হলো। অনুষ্ঠান শেষে এই চরে আরো চার-পাঁচদিন থাকার আমন্ত্রণ এলো। বিভিন্ন বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা কোনভাবেই ছাড়তে চাইলেন না তমালকে। গানের মধ্যে যে এতো আত্মিক ভাললাগা আছে তা তারা আগে কখনো ভাবেনইনি। কিন্তু হলে ফিরে আসতেই হলো তমালকে। কারণ পরীক্ষা, ক্লাস আরও কত কার্যক্রম পড়ে আছে। চলে আসার সময় হাজার লোকের ছলছল চোখ যেন বার বার বলছিল- তুমি আমাদের অন্তরের কেউ, আমাদের রেখে যেও না। তোমার সুরের পরশে আবিষ্ট আমরা অন্ধ ভক্ত তোমার। হৃদয়ের ভেতর থেকে যে ভালবাসার উদ্গীরন ঘটে তার প্রকাশ বোধহয় এমনি। এ অপ্রকাশ্য অসাধ্য কর্ম অক্ষরে বানানো শব্দের ঘেরে। অঞ্জনদত্তের সেই গানটি যেন নেপথ্যে ভেসে আসছিল ভাবের সেই করুণ আবহে- ও গানওয়ালা, আরেকটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাবার নেই। কিচ্ছু করার নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম পূরণ ও জমা দেয়ার কাজ চলছে। মাহিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের মাঠে বন্ধু বান্ধবসহ ভর্তিফরম পূরণ করে কাগজ-পত্রগুলো সাজাচ্ছিল। হঠাৎ একটি অপরিচিত মেয়ে মাহিনের ভর্তি ফরমটা হাতে তুলে নিয়ে প্রশংসা শুরু করলো- এতো সুন্দর লেখা? এতো সুন্দর করেও হাতে লেখা যায়! কার এটা? মাহিনের বন্ধুরা বলল- মাহিনের, এই ছেলেটির লেখা এটা। মেয়েটি- আর কিছু তো আপনার দরকার নেই। এই লেখা দিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব। মেয়েটির কোন কাজের তাড়া ছিল হয়তো, তাই বাই বলে দ্রুতই প্রস্থান করলো সে। পৃথিবীটা গোল, সময়ের আবর্তনে বিভিন্ন প্রয়োজনে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের সাথে মানুষের পরিচয় ঘটে, আবার বিচ্ছেদও হয়। কিন্তু প্রয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু যখন ঢাকা শহর, তখন তো যে কারো সাথেই যেকোন সময় দেখা হয়ে যাওয়াটা সাধারণই বটে। বিশ বছর পর ঢাকা মেডিকেলের সামনের ফুটপাতে হেঁটে যেতে দেখা হলো মাহিনের সাথে সেই মেয়েটির। বয়স আর ছাত্র-চাকরিজীবি এই পার্থক্যের কারণে মাহিনের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে কিন্তু তবুও চিনতে কষ্ট হলো না সেই মেয়েটির। -এ্যাই, ভাই আপনি মাহিন? কিছু মনে করবেন না, হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। চশমা খুলতে খুলতে -হ্যাঁ, কিন্তু আপনি? -আমাকে আপনার মনে নাও থাকতে পারে। তবে আপনাকে মনে রাখতে পেরেছি আপনার চমৎকার হাতের লেখার জন্য। সেদিন আমার অনেক ব্যস্ততা ছিল বলে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু মস্তিষ্কের মেমোরীতে আপনার মুখচ্ছবি আর নামটা চিরস্থায়ী হয়ে যেন গাঁথা হয়ে রইল। এমনটা কেমন করে হয় জানি না, তবে এটা হতে পারে বিশ্বাস করি। কারণ মানুষের মন আর মস্তিষ্কের ভেতরে বেশি ভাললাগার বিষয়গুলো স্বয়ংক্রীয়ভাবেই দাগ কেটে যায়। তাই কষ্ট করে মনে রাখার মতো করে কিছু করতে হয় না। আমার বিশ্বাস আমার এই কথাগুলোও আপনার ভাল লেগেছে, এটাও মনে থাকবে। আবার দেখা হলে জানাবেন। চলে গেল মেয়েটি, না এখন সে মেয়েটি নয়, নারীটি। সৌম্য, ভদ্র, সুন্দর করে কথা বলতে পারা এক নারী। তার চলার গতিপথে অনেকটা ক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকলো মাহিন।

লোকাল ট্রেন। গাদা গাদা মানুষ, রাত্রের জার্নি। কোনমতে ধরে ঝুলে থাকার মতো একটা হ্যান্ডেল নাগালে পেলেই যেন যথার্থ স্বস্তি। এতো ভীড়ের মধ্যেও কচি একটা কণ্ঠের অনর্গল প্রমিত ভাষায় কথপোকথন যেন আকর্ষণ করছিল সবাইকে। ভীড় ঠেলে কাছে যাওয়া প্রায় অসম্ভবই, কিন্তু অনেক কোলাহলের মাঝেও সুন্দর উচ্চারণ আর স্পষ্ট এই কণ্ঠস্বরের মানুষটিকে না দেখলে যেন কোনভাবেই নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না তানহা। তানহা আবৃত্তির ছাত্র। শুদ্ধ উচ্চারণের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার পার্থক্য গুলো কেমন হয় তা নিয়ে আগ্রহের যেন শেষ নেই। অংকের মতো স্ট্রেইট, নো কম্প্রোমাইজ আর নিরস একটি সাবজেক্টে পড়াশোনা করলেও ভাষা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই তার। তার সাথে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকা আরও দুই বন্ধুকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল সে। বন্ধুরা টিজ করে বলল- ঐ যে গেল, ভাষাবিদ, উচ্চারণবিদ; কোথায় কোন কণ্ঠ শুনেছে আর অমনি তার উৎস উদ্ধারে পাগল হয়েছে। তানহা মনে মনে বলল- কবি নজরুলকেও তার সময়ের মানুষরা পাগল বলে ডাকতেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, দশ-বার বছর বয়সী একটি কিশোরী মেয়ে। পরনে ময়লা নোংরা থ্রিপিস। চুলগুলো এলোমেলো তবে ব্যাকব্রাশ করে গুছিয়ে বাঁধার চেষ্টা করেছে মনে হলো। কিন্তু এতো ভীড় আর ছোটখাট দু’একটি পোটলা-পাটলা বয়ে নেবার কারণে ঘর্মাক্ত আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটা সীটের সাথে ঠ্যাস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট একটি দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে সীটের কাছে মাঝফ্লোরে বস্তায় বসে আছে তার মা। কিশোরী এই মেয়েটিই এতো সুন্দর করে কথা বলে যাচ্ছিল তার মা এবং ছোট্ট কোলের ভাইটির সাথে। তানহা- চাচি, আপনার মেয়ে তো খুব চটপটে, এফএম রেডিও’র জকিদের মতো করে কথা বলে। কোথায় কাজ করেন আপনি? কোথায় থাকেন? -বাবা, মধ্যবাড্ডায় এক সাহেবের বাসায় কাজে রাখছিলাম এই মাইয়াডারে। সাহেবের পেলেতে (প্লে ক্লাস) পড়া মাইয়ারে পারাইভেট কারে কইরা ইসকুলে নিয়ে যাইত, কেলাস চলা পর্যন্ত অপেক্ষা কইরা তারপর আবার ঔ কারে কইরা বাসায় ফিরত। ইসকুল আর সাহেবদের সাথে থাইক্যা ভাষা চেইঞ্জ হইয়্যা গেছেগা। -আপনার মেয়েকে তারা নতুন জামা কাপড় দেয়নি? বাড়ি ফিরছে নোংরা জামা পরে। -নতুন জামা দিছিল, সাহেবদের বাসার ড্রাইভারকে বোধহয় তারা কইয়া দিছে, নতুন জামা রাইখ্যা যাইতে কইছে। বিশ্বাস করে নাই আমগোরে, যদি মাইয়্যারে আর ফিরাইয়্যা না দেই। -তোমাদের বাড়ি কোথায়? মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো তানহা। -ইসলামপুরে। -ইসলামপুরের ভাষা ভুলে গেছ? -না, তবে সাহেবদের ভাষা আমার খুব ভাল লাগে। তানহা বুঝতে পারলো এই মেয়েটির মন ভাষার শুদ্ধরূপটি আকৃষ্ট করেছে বলে রপ্ত করে নিয়েছে সহজে, আবার মেয়েটি এমন করে কথা বলার ব্যাপারটিও আকর্ষণ করলো তানহাকে। যেন মনের গহীনে দাগ কেটে গেল।

ময়মনসিংহের একটা মেসে থেকে অনার্স পড়ছিল তাহের। লম্বা পাঞ্জাবী মাথায় টুপি। এই তার নিত্যবেশ। নামাজ-কালাম অধিকাংশ সময় মসজিদেই পড়ে। কিছুলোক নামাজ নিয়মিত পড়লেও ফজরটা নিয়ে প্রশ্ন করলে নামাজ কাযা হওয়ার উত্তরটাই বেশি আসে। তাহেরের ফজর কখনো মিস হয়নি। টগবগে যুবক সকালে মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ে ফেরার সময় তসবিহ জঁপতে জঁপতে ফেরে। ভীষণমাত্রায় আল্লাহবিশ্বাসী। অনেক ঘটনা থেকে একটি ঘটনা তুলে আনা যেতে পারে। একবার তার কষ্টার্জিত টিউশনীর টাকায় কেনা শখের সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা পড়ার কক্ষ থেকে চুরি হয়ে যায়। পাশের কক্ষের বন্ধু রহিমের কাছে ব্যাপারটা বলল। রহিম তাহেরের ভাল বন্ধু, তাহেরের আবেগটা ভাল বুঝতে পারে। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে কেনা ক্যালকুলেটরের জন্য তাহেরের বুকে কত কষ্ট হতে পারে তা সহজেই অনুমান করতে পারলো রহিম। বোঝানোর চেষ্টা করলো। চিন্তিতও হলো। ভাল বন্ধুর মন খারাপ হলে অপর বন্ধুর কি আর ভাল লাগতে পারে? রহিমের মন খারাপ দেখে উল্টো তাহেরই রহিমকে সান্ত্বনা দিতে থাকলো। বলল- দোস্ত, এটা হতেই পারে। তাছাড়া আরও বড় কোন ক্ষতি যদি হতো। তাছাড়া যে নিয়েছে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজন ছিল বলেই তো নিয়েছে। আমার না হয় কষ্ট হবে আবার আরেকটা ক্যালকুলেটর কিনতে, কিন্তু যে নিয়েছে আমারটা সে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজনটা মিটিয়ে খুশি হয়েছে। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু করতে তো খুব একটা পারছি না। এভাবেইও যদি কিছু করা হয়ে যায়, তো মন্দ কি? আল্লাহ তার সৎ বুদ্ধি উদিত করুক, আর মাফ করে তার জ্ঞান বৃদ্ধির সুযোগ করে দিন। এরপর কোনদিনও আর এ ব্যাপারে ইস্ উহ্ বা আফসোস করে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি তাহেরের মুখে। তাহেরের এই আচরণ সত্যি বিমোহিত করে রহিমকে। মনের ভেতরে আজো এই ঘটনাটি দাগ কেটে আছে। হাদিস কোরআনে এই বিষয়গুলো বর্ণনা করা থাকলেও, কাছের কারো কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ দেখলে তখন তা মনে রেখাপাত করে। রয়ে যায় আজীবন।

জেলা শিল্পকলার আয়োজনে জাতীয় এক অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলছিল। ক্যাপ মাথায় শিল্পকলার গানের শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী মাসুম নজরুল সঙ্গীত গেয়ে মাতিয়ে দিলেন পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকগণ মাসুমের হাতে গুঁজে দিচ্ছিলেন চকচকে টাকার নোট। সেই অনুষ্ঠানে একটি মেয়ের গান তার কাছে ভাল লেগে যায়। মেয়েটি দশ-বার বছর বয়সী হবে। গান গাওয়ার পর পানি খাবে বলছিল। মাসুম মেয়েদেরেকে খুব একটা পাত্তা কখনোই দিত না। কিন্তু এই মেয়েটার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হলো কেন সে জানে না। দু’একজন ছেলে মেয়েটির পানি পানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পানি আনতে চলে গেল। মাসুম আজ যেন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। ছুটে গেল পানি আনতে। একটা গ্লাসে করে দ্রুতবেগে পাশের এক টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে মেয়েটির হাতে তুলে দিল মাসুম। মেয়েটি পানি পান করছে আর মাসুম হা করে তাকিয়ে দেখছে পানি পানের দৃশ্য। চিকন চাকন মায়াবী চোখের মেয়েটিকে কেন যেন ভালবাসার মতো ভাল লেগে গেল। তার উঁচু গ্রীবা বেয়ে পানি ঢক ঢক করে বয়ে যাওয়ার সময় যে ছন্দের সৃষ্টি হলো, তা যেন বুকের ভেতরে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দিল। মাসুম এভাবে কখনোই কাউকে ভাবতে পারেনি। কিন্তু আজ তার কি হলো? মেয়েটি ধন্যবাদ ভাইয়া বলে মিষ্টি করে হাসলো। ডাগর চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল- ভাইয়া আপনি এতো সুন্দর করে গাইলেন, যেন নজরুল সঙ্গীত নতুন করে অসাধারণ মনে হলো আমার কাছে। অনেকদিন পর হঠাৎ এক মার্কেটে মেয়েটির সাথে দেখা হলো মাসুমের। মাসুম পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। মাসুমের লম্বা চুল আর পরিচিত স্টাইলে মাথায় ক্যাপ পরা অবস্থায় দেখে চিনে ফেলল মেয়েটি আর ডেকে বলল- ভাইয়া, মনে আছে? কোন এক অনুষ্ঠানে পরম যতœ করে এক গ্লাস পানি খাইয়েছিলেন আমাকে। -হ্যাঁ, তোমাকে কেন যে এতো ভাল লেগেছিল সেদিন, জানি না। হৃদয়ের কোন এক অংশে তোমার না দেখা স্পর্শটি হয়তো দাগ কেটে গিয়েছিল তাই। -আমিও শুধু আপনার এক গ্লাস পানির জন্য মনে রেখেছি আপনাকে; কষ্ট করে নয়, এটাও দাগ কেটেছিল আমার মনে।

কোচিং-এ ক্লাস নিয়ে ফিরছিল কিবরিয়া। ফার্মগেট থেকে বাঁ পাশের ফুটপাত ধরে কাওরান বাজারের ভেতর দিয়ে ক্রস করে এফডিসির দিকে যাচ্ছিল। জেলা শহর থেকে আসা এক ভদ্রলোক তার ছেলের কাছে কাঁঠাল বাগানের কোন এক মেসে যাবেন। বেশ কয়েকবার ভুল করে কাওরান বাজারের ভেতরে ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে বাজারের এক দোকানে বসে চা পান করছিলেন। কিবরিয়াও সেখানে চা পানের জন্য বসলেন। -ভাই চা দাও তো। -স্যার আদা চা না দুধ চা খাবেন? -আদা চা-ই দাও। কণ্ঠের ব্যবসাই করি, কণ্ঠই যদি ঠিক না থাকলো তবে কমেন করে হবে? লেকচার আর লেকচার। -কিসের লেকচার স্যার? -কোচিং-এর লেকচার। পাশে বসে নীরবে চা পান করতে থাকা ভদ্রলোককে ক্লান্ত লাগছিল। বুঝতে পারা যাচ্ছিল কোন সমস্যায় পড়েছেন তিনি। -চাচা, আপনি আশে পাশেই কোথাও জব করেন? -না, আমার ছেলের কাছে এসেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি, উল্টা-পাল্টা কি বললেন, এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্তই হয়ে পড়েছি। ঢাকা শহরের অভিজ্ঞতা কখনোই ভাল ছিল না। মানুষগুলো কেমন যেন। -চাচা, আমার হাতে তো সময় নেই। তবে আপনাকে লোকেশন বলে দিচ্ছি আর ঠিকমতো করে বুঝিয়ে দিচ্ছি, আপনি এভাবে যান ঠিক ঠিক আপনার ছেলের বাসা পেয়ে যাবেন। রাত্রে ভদ্রলোক কিবরিয়াকে কল করে ধন্যবাদ দিলেন আর জানালেন উনি ঠিকমতো তার ছেলের বাসা খুঁজে পেয়েছেন। মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মনের অবস্থা সহজেই বোঝা সম্ভব। তবে তার জন্য কিবরিয়ার মতো গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। অন্যের মনে দাগ রেখে যাওয়ার মতো কাজের জন্য অনেক বড় কাজ করতে হয় না। ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েও মানুষের মনে ঠাঁই করে নেয়া যায়। দশ বছর আগের কথা, ভদ্রলোক এখনো কল করেন, ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করেন। ভদ্রলোকের একটি কথায় বেশ অনুপ্রাণিত হন কিবরিয়া, তা হলো- আপনার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর আছে। সেই বিশ্বাসই অপরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।

মানুষ। অনেক সম্ভাবনার এক স্পষ্ট জ¦লজ্বলে উদাহরণ। সৃষ্টির সকলকিছুর মধ্যে সেরা এই জীবটি মানবিক হবে, হবে দাগকেটে যাবার মতো স্মরণীয়। এটাই কাম্য, কামনা। পৃথিবীর গোলাবর্তে ঘূর্ণায়মান সৌরমন্ডলে এই প্রাণীটির সমাদর অনেক। মহান আল্লাহ অনেক শখ করে আর বিশ্বাস নিয়ে বানিয়েছেন এই মানুষকে। এই মানুষের কাছে তাই সর্বোচ্চ ভালকিছুর প্রত্যাশা সকলকিছুর। মনে রেখাপাত করে, উত্তম কাজের স্মরণ করে প্রশংসায় ভক্তিতে আবেগাপ্লুত হবে কেউ এটাই একে অপরের কামনা। সাধনা এটাই হওয়া উচিৎ। না হলে মানুষ নামটিই বেমানান হবে। সমাজে এমন লোকের অভাব নেই যারা অন্যকে কষ্ট দিতে পছন্দ করে। অন্যকে বোকা বানিয়ে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধ্বংস ডেকে আনতে যারা প্রতিমুহূর্তে চিন্তা করে, তারা মানুষ নয়। তারা অর্থব, বেকুব। সাময়িক লাভকে তারা দীর্ঘমেয়াদী সুখ মনে করে মিথ্যে আস্ফালন করে। সময়ের পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্য এরা বোঝে না। অসীম সময়ের ক্ষুদ্র অংশকে অনেক বড় সময় ভেবে ভুল করে। মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে অন্যের মনে ঠাঁই নেবার চেষ্টা থাকা উচিৎ। মনে ঠাঁই নেবার ব্যাপারটা অতো সহজ নয়। মন বড় বিচারক। সে কখন কিভাবে বিচার করে কাকে বেছে নেবে তা বোঝা মুশকিল। মন শুধু মন ছুঁয়েছে, ও সে তো মুখ খোলেনি। ও হো হো হো…। সুর শুধু সুর তুলেছে, ভাষা তো দেয়নি। তাই মন ছুঁতে চাইলে মনের মতো হতে হবে। ভেতরকার আলো প্রজ্জ্বলিত হলেই কেবল মন ছুঁয়ে দেয়া যায়। অন্ধকার, কালিমা আর অবৈধ কৌশল মনের গহীনে রেখে শুদ্ধ হওয়া যায় না। সৎ, পরোপকারী হলে তার জন্য ভাল অপেক্ষা করবেই। যদি দৃশ্যত ভাল নাও দেখা যায়, তাও কোন সমস্যা নেই, মানসিক যে তৃপ্তি পাওয়ার ব্যাপার থাকে তা স্বর্গসম। পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়ে আছেন, তারা কোন না কোনভাবে মানুষের মনকে জয় করেছেন। সে কারণেই মানুষ তাদেরকে যুগের পর যুগ স্মরণ করে।

বিচলিত তব নিঃস্ব হও পরের তরে তৃপ্তি তোমা হতে না রবে বেশি দূরে
হৃদে না বসি আসন করো অন্য হৃদে মন-প্রাণে থাকো পুত-পবিত্র জাগ্রত কি নিদে
দাগ কেটে যাও প্রতি মনে শুদ্ধ সত্যের তরে থাকো জীবিত অনন্তকাল হও অমর মরে।
লেখক: এস জে রতন কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী
sjratan@gmail.com
পাতাটি ৪৭৪৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা



এমাজউদ্দিন আহমেদ::
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা জেসিসির তৃতীয় বৈঠকে যোগ দিতে। গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের প্রতিনিধিদলের নেৃতত্ব দেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তিনি গত জুনে ঢাকা সফর করে গেছেন। অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভার দুই পক্ষই বারবার উচ্চারণ করে যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়ে চলেছে। কিন্তু যে দুটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আশা করা গিয়েছিল- তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্ত সম্পর্কিত বিষয়- সে ক্ষেত্রে আবারও মিলেছে প্রতিশ্রুতি। অনেক ভালো ভালো কথা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনায় অগ্রসর হলেও যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলে তৈরি হয়, সেই দূরত্ব মস্ত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো বাধা সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নেতৃত্বের সামনে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময়ও তা অনুভূত হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশনের বিবৃতিতে রয়েছে ৩৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে ৭ নম্বরে রয়েছে সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়টি এবং তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি রয়েছে ২৪ নম্বরে। এ সম্পর্কে শুধু একটি বাক্য উচ্চারিত হয়েছে। দুই মন্ত্রী তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই দেশের মূল সীমান্ত সম্পর্কেও একটি বাক্যে দুই মন্ত্রী তাঁদের বক্তব্য শেষ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বিষয়ে প্রটোকল স্বাক্ষরের পর এর র্যাটিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কাজ চলছে। অন্য কথায়, ড. মনমোহন সিংয়ের সময়ে এ দুটি বিষয় যে অবস্থায় ছিল, এখনো সে অবস্থায় রয়েছে। যৌথ বিবৃতির ১৩ নম্বরে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি। এতে অবশ্য ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যের কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগের কথা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য আগ বাড়িয়ে বলেছেন, বিনিয়োগের সুবিধার জন্য, বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার জন্য, জমিও দেবে ভারতকে বাংলাদেশ। এ সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো হোমওয়ার্ক আছে কি না তা জানি না। অন্য কথায়, আমাদের প্রতিনিধিদের অন্যকে দেওয়ার প্রবণতাটা উল্লেখযোগ্য। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাপানের পক্ষে। এতে জাপানের খুশি হওয়ারই কথা, কেননা জাপানের জয়লাভের পথ প্রশস্ত হলো। কিন্তু জাপান থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ কি বাংলাদেশ পাবে? যৌথ বিবৃতির ৯ নম্বরে রয়েছে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্তে প্রাণহানি কমিয়ে আনতে ভারতের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা দুই ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের সীমান্তজুড়ে তারকাঁটার বেড়া প্রদানের কাজটিও সমাপ্ত করার কথা বলেছেন; কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশের জনগণকে আর হত্যা করা যেন না হয়, তা বলেননি। কর্তৃত্বব্যঞ্জক বক্তব্যের জন্য জাতীয় ঐক্যের আশীর্বাদপুষ্ট হতে হয়।

জাপান একটি গণতান্ত্রিক দেশ। নিয়মিত সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে। প্রতিবেশী ভারতেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নিয়মিত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ৫ জানুয়ারিতে বাংলাদেশে যা হয়েছে তা জাপানও জানে। জানে ভারতও। ভারতের তখনকার কংগ্রেস সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ওই নির্বাচনে ক্যানভাস করতেও এসেছিলেন, যেন ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থেকেই যান। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : ‘একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ৩০০ সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।’ তবে সংবিধানে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাবে একক প্রার্থীর নির্বাচনও স্বীকৃত টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা যদি এমন হয় যে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ছাড়াই তারা সরকার গঠন করতে পারবে, তাহলে সংবিধানে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার যে বিধান রয়েছে তাকে অকার্যকর করে দেয় এবং ফলে তা অসাংবিধানিক হয়ে পড়ে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন ১৫৩ জন। টেকনিক্যালি হয়তো তাঁরা সদস্য হওয়ার যোগ্য। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে, বিশেষ করে নৈতিক দিক থেকে ভেবে দেখুন তো জাতীয় সংসদে তাঁদের বসা উচিত কি না? অন্য ১৪৭ জনের ক্ষেত্রেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। অন্য কথায়, এই সংসদ কি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে? পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে সৃষ্ট জটিলতার কারণে বাংলাদেশে যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান তো আমাদের জাতীয় নেতৃত্বকেই করতে হবে। আমার বিশ্বাস, তাঁদের সেই প্রজ্ঞা রয়েছে। নেই শুধু আগ্রহ। নেই কোনো সদিচ্ছা। এর সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশে ভালো ভালো কথা বলছেন। কিন্তু নিজের দেশের সমস্যা অনুধাবন করে একটা ভালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কেন?

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কার্যত সীমাহীন। তিনি দলের নেতা। তিনি মন্ত্রিসভার প্রধান। তিনি জাতীয় সংসদের নেতা। কয়েক দিন আগে শুনলাম, বিরোধী দলের এক নেতার বাণী : তিনি বিরোধী দলেরও নেতা। ষোড়শ সংশোধনীর পরে তিনি বিচারালয়ের, বিশেষ করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের দায়িত্ব পেলেন। দায়িত্ব পেলেন দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন, কর্ম কমিশন, নির্বাচন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অপসারণেরও। সংবিধানের ৫৫ ও ৭০ অনুচ্ছেদ বলে তিনি এমন সব কিছু করতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও কল্পনা করতে পারেন না। মোগল সম্রাট, এমনকি রাশিয়ার জারদের (Czar) থেকেও পরম পরাক্রমশালী আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তার পরও বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানে এত অক্ষম!

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাতাটি ২৮০৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…

ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!



দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল নেই কেন? তাদের দাদীর মতো কোনও নেত্রী নেই কেন? থাকলে তাদের এত তাড়াতাড়ি মালয়েশিয়ায় ফিরে যেতে হতো না। দাদীর সাথে দাদীর অফিসে থাকতে পারত। এখানে কত থ্রিল। দাদীর অফিসের চারপাশে পুলিশ, গোয়েন্দা, সাংবাদিক গিজগিজ করে। মধ্যরাতে হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। মোমবাতি জ্বালিয়ে রাত পার করতে হয়। তারা অত রাজনীতি বোঝে না। তাদের কাছে পিকনিক পিকনিক লাগে। কিন্তু এখন বাবাকে হারানোর ব্যথা কাটানোর আগেই তাদের মালয়েশিয়া গিয়ে বসতে হবে পরীক্ষায়। কোনও মানে হয়!

দৃশ্য ২. অনিন্দ্য রহমান আর জাকিয়া আহমেদেরও মন খুব খারাপ। সারাবছর প্রস্তুতি নিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা নিয়ে মায়েদের যত মাথাব্যথা, তাদের ততটা নয়। পরীক্ষা নিয়ে তাদের টেনশন আছে। তবে তাদের প্রতীক্ষা পরীক্ষা শেষ হওয়া নিয়ে। পরীক্ষা শেষে কী কী করবে, কোথায় কোথায় যাবে, তার লম্বা তালিকা তৈরি। এসএসসি পরীক্ষা শেষ মানেই বড় হয়ে যাওয়ার লাইসেন্স। শুধু জাহিয়া, জাফিয়া, অনিন্দ্য আর জাকিয়া নয়; আসলে গোটা বাংলাদেশেরই মন খারাপ। সকালে ঘুম ভাঙে পেট্রোল বোমায় ৭ জনের পুড়ে অঙ্গার হওয়ার খবর দিয়ে। বাংলাদেশ ঘুমোতে যায় টানা হরতালের ঘোষণা নিয়ে। দেখা হলেই একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, ভাই এর শেষ কোথায়? কী হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে দেশ? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। দেশটা যেন মগের মুল্লুক হয়ে যাচ্ছে। কে যে কী করছে বোঝা যাচ্ছে না। টানা অবরোধের বিশ্ব রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মৃত্যুর তালিকায় প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বিরোধী দল দাবি করছে, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। তাহলে বোমাগুলো মারছে কে? পত্রিকায় লেখা হয়, দুর্বৃত্তরা বোমা মারছে। এই দুর্বৃত্ত কারা?
বেগম খালেদা জিয়া ৩ জানুয়ারি রাত থেকে তার গুলশান অফিসে থাকছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তবে সরকার বলছে, বেগম জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয়নি। তিনি নাটক করছেন। তবে বাস্তবে বিএনপির দাবিই সত্য বলে মনে হয়েছে। পুলিশ ইটের ট্রাক, বালুর ট্রাক দিয়ে পথরোধ, গেটে তালা দিয়ে সরকারের দাবি মিথ্যা আর বিএনপির দাবিকে সত্য প্রমাণ করেছে। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন সরকার সব ধরনের অবরোধ তুলে নিলো, তখনও বেগম জিয়া অফিসেই রয়ে গেছেন। জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়া অফিস থেকে বেরুলেই তার অফিসটি সিলগালা করে দিতে পারে সরকার। গত ৩ জানুয়ারি রাত থেকে নয়াপল্টন অফিস সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। তাই এই অফিসটি রক্ষায় বেপরোয়া বেগম জিয়া। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে একটি গণতান্ত্রিক দলের অফিস কেন সিলগালা করে রাখা হবে? বেগম জিয়াকে গুলশানের অফিস থেকে বের করার জন্য সরকার নানা কায়দা কৌশল করছে। শ্রমিক, দিনমজুর, শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে বেগম জিয়ার অফিস ঘেরাও করতে। তবে সবচেয়ে খারাপ কৌশলটা করেছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। গত শুক্রবার বিকেলে এক সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন, বেগম জিয়ার অফিসের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এমনকি বেগম জিয়ার খাবারের সরবরাহও কেড়ে নেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। যাতে বেগম জিয়া গুলশান অফিসে না খেয়ে মরে পড়ে থাকেন।

মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্য, একজন আইন প্রণেতা এমন বেআইনী কথা বলতে পারেন, এটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তারপরও আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি, রাজনীতিবিদদদের মেঠো বক্তৃতা হিসেবে। কিন্তু আমার বিস্ময়ের সীমা অতিক্রম করে শাজাহান খানের ঘোষণার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বেগম জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরদিন বিচ্ছিন্ন করা হয়, ক্যাবল টিভি ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ। ১৯ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হলেও এখনও ক্যাবল টিভি আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নেই। অফিসের লোকজনের সময় কাটে বিটিভি দেখে। এটা কম শাস্তি নয়। কিন্তু মজাটা হলো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রীর ঘোষণার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও শাজাহান খান বলছেন, সরকার এটা করেনি, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। গুলশান থানা বলছে, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। ডেসকোর চেয়ারম্যান বলছেন, তিনি কিছু জানেন না। এমনকি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, তিনিও কিছু জানেন না। কী আশ্চর্য! সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হবে, আর কেউ কিছু জানবেন না, এটা কিভাবে সম্ভব। সরকার তাহলে কে চালাচ্ছে? শাজাহান খানের কথা যদি সত্য হয়, যদি সবার অজান্তে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরাই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে থাকে, তাহলে সেই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, তারা মধ্যরাতে এলেও গোপনে আসেনি। রীতিমত টিভিতে সাক্ষাতকার দিয়েছে তারা। বেগম জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্পর্কে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ইটস এ ব্যাড পলিটিক্স। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা রাজনীতির অংশ হতে পারে না।’ মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ঠিক বলেছেন, দেশে যা চলছে, তা নিছক ‘ব্যাড পলিটিক্স’ নয়, ‘ভেরি ব্যাড পলিটিক্স’। আমরা দিন গুনছি উজ্জ্বল বাংলাদেশের, গুড পলিটিক্সের।
লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।
ইমেইল: Probhash2000@gmail.com

(* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য দশদিক কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

পাতাটি ২৭৩৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…

জাপানের বৃদ্ধাশ্রম



আশির আহমেদ:
পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭ বছর, পুরুষ দের ৮২। কিন্তু এটা কি গর্ব করার জিনিস? জানিনা। চিন্তা করতেই মাথা ব্যথা শুরু হলো। ১৯৮৮ সাল। জাপানের এক স্কুল শিক্ষকের সাথে কথা। সরকার দ্রব্যমূল্যের উপর ৩% কর বসাতে যাচ্ছেন। উনার এটা পছন্দ না। অপছন্দের কারণ টা বুঝালেন এভাবে – একটা কাগজে কলসির মত একটা ছবি আঁকলেন। বললেন এটা জাপানের জনসংখ্যা পিরমিড। নীচের আর উপরের অংশ সরু আর পেট খানা মোটা – মানে হল শিশু আর বৃদ্ধের সংখ্যা কম আর যুবকদের সংখ্যা বেশি। যুবকরা উপার্জন করছে, বৃদ্ধ ও শিশুরা ভোগ করছে।

২৫ বছর পর এই জনসংখ্যা পিরমিডের কলসিটা হবে উল্টো। বুড়োদের সংখ্যা হবে বেশি। কাজ করার লোক হবে কম, খাওয়ার লোক বেশী। দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়বে। এখন থেকে ৩% কর জমিয়ে রেখে ২৫ বছর পর কাজে লাগানো হবে। এই হচ্ছে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উনার ধারনা, এই টাকা সরকার অন্যত্র ব্যয় করবে। ১৯৮৯ সাল থেকে কর তোলা শুরু হলো। বছরে এই ট্যাক্স থেকে আয় হয় ১০ ট্রিলিয়ন টাকা।

২৫ বছর কাটলো। তখনকার ৪০ বছরের যুবক এখন ৬৫। বৃদ্ধের খাতায় নাম লিখাচ্ছেন। ইতিমধ্যে সরকার ও লোভী হয়ে উঠলেন। ধাপে ধাপে কর বাড়ালেন। ৯৭ সালে ৫%, ২০১৪ সালে ৮%। ২০১৫ এর অক্টোবর থেকে হবে ১০%। স্কুল শিক্ষকের ভবিষ্যৎবাণী ঠিক ছিল। সরকার অন্যত্র খরচ করা শুরু করেছেন। ২৫ বছরে আর কি কি বুঝলাম ? চোখের সামনে জনসংখ্যার পরিবর্তনটা দেখলাম। কতগুলো আচানক ব্যাপার ও চোখে পড়লো।

(১) হু হু করে কমলো তরুণ জনসংখ্যা : জাপানী এক ছাত্রের সাথে গল্প করছিলাম। আমাদের দুজনের মিল হলো দুজনেই গ্রাম থেকে এসেছি। অমিলটা হলো- আমি মোটামুটি সব খেলাধুলাই জানি। সে জানে শুধু টেবিল টেনিস। কাহিনী কি ? প্রাইমারি থেকে জুনিয়র হাই স্কুল পর্যন্ত তার ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা ছিল সব মিলে এক। শিক্ষকের সংখ্যা ও এক। খেলাধুলার ক্লাসে একটা খেলাই দুনপ্রিয় (দুজনের প্রিয়) ছিল সেটা হলো – টেবিল টেনিস। এধরনের ছাত্র বিহীন স্কুল সরকার কতদিন চালাবেন? কত আর ভর্তুকি দিবেন? ঠুস ঠাস করে প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল গুলো বন্ধ হওয়া শুরু হল [১] । জাপানে মানুষের বাচ্চার চেয়ে পোষা কুকুরের সংখ্যা বেশী। কুকুরের সংখ্যা হলো ২০মিলিয়ন আর ০-১৫ বছরের শিশুর সংখ্যা ১৫মিলিয়ন। লাও ঠেলা। সরকার এখন জনসংখ্যা বাড়াতে চাচ্ছেন। একটা করে সন্তান দে,৪ লাখ টাকা গুনে নে- জ্বি, প্রতি বাচ্চার জন্য সরকার ৪ লাখ টাকা করে অফার করছেন। বাচ্চাদের শিক্ষা চিকিৎসা সবই ফ্রি করে দিয়েছেন। তারপর ও উর্বর দম্পতিদের মন গলাতে পারছেননা। সোশ্যাল ইন্টারকোর্স বাড়ানোর জন্য সাপ্তাহিক ছুটি একদিনের জায়গায় দুইদিন করলেন, ওভারটাইম কে ডিসকারেজ করলেন। শনিবার রাতে টিভিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য স্পেশাল প্রোগ্রাম ও বানালেন। তেমন ফলাফল এলোনা। আজকাল যুবকরা বিয়ে করতেই রাজি হচ্ছেন না। ৩০ এর উর্ধে অবিবাহিত মহিলাদের সংখ্যা কত জানেন? সমীক্ষা বলছে, ৩০-৩৪ বছর বয়সের অবিবাহিত মহিলার সংখ্যা ৪৭% [২]। এর মধ্যে আমাদের ফুকুওকা শহর সবার উপরে।

জাপান সরকার এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সাহায্য কামনা করতে পারেন। আমরা জনসংখ্যা কমাতে চাই, উনারা বাড়াতে চান। উইন উইন সিচুয়েশন। ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই। পৃথিবীর গোটা-বিশেক দেশের গ্রাম/ছোট শহর দেখার সুযোগ হয়েছিল। স্কটল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এর গ্রাম/উপশহর গুলো দেখেছি। জনসংখ্যার অভাবে উপশহরগুলো কেমন যেন প্রাণহীন, মৃতপ্রায়। নো মানুষ, নো ইকনমিক এক্টিভিটি। বুঝতেই পারছেন জাপান সরকার কেন স্কিল্ড বিদেশি আমদানি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের জন্য হতে পারে একটা বিরাট বিজনেস চান্স। ইতিমধ্যে মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপিনোরা এই চান্সটুকু কাজে লাগানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। বড় টার্গেট জাপানের বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী। এদের টাকা আছে। উদ্দেশ্য হলো এই বৃদ্ধদের জন্য নূতন সার্ভিস ক্রিয়েট করে নূতন ব্যবসা ডিজাইন করা। অন্যতম হচ্ছে হোম-কেয়ার।

(২) বৃদ্ধদের একা থাকা : ১৯৯৮ সালের কথা। পি,এইচ,ডি-র ছাত্র তখন। ইন্টারনেট ট্রাফিক এনালাইসিস নিয়ে কাজ করছি। ক্যাম্পাস থেকে ১৪ কিমি দুরে এক ডাটা সেন্টার থেকে নেটওয়ার্ক ট্রাফিক ডাটা নিয়ে আসতে হতো। একদিন আধা কিলো ডাটা (৫০ গ্রাম x ১০ টা সিডি) নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরছি। অগাস্ট মাস দুপুর বেলা। প্রচণ্ড গরম। গাড়িতে এ,সি নেই। গান গাইতে গাইতে গাড়ি চালাচ্ছি। দেখি, এক বুড়ি রাস্তার পাশে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখলাম, কিন্তু থামলাম না। জাপানে সাধারণত কেউ লিফট চায়না। বড়ই বিরল। কৌতূহল কমাতে না পারে ইউ-টার্ণ করলাম। উনার পাশে গাড়ি থামাতেই উনি দরজা খুলে পিছনের সিটে বসলেন। একটা হাসপাতালের নাম বললেন। চিনলাম। আমাদের ক্যাম্পাসের পাশেই। গাড়ি চলছে। উনি ও কথা বলছেন না। আমি ও না। এই নিস্তব্দতা টা দারুণ পীড়াদায়ক। উনি নির্ঘাত আমাকে ট্যাক্সি ড্রাইভার ভাবছেন। এই ভুল ভাবনাটা দুর করার জন্য হলেও কথা বলাটা দরকার। আমিই শুরু করলাম। আতসুই দেস নে (খুব গরম তাই না? )। বিদেশে কথা শুরু করার জন্য আবহাওয়া একটা চমৎকার টপিক। বুড়ি কথা বললো না। মেজাজ টা খারাপ হলো। এবার আমার চুপ থাকার পা
লা। একটু পর উনিই কথা তুললেন। -কোনদিকে যাচ্ছ? কাতাহিরা ক্যাম্পাস। আপনার হাসপাতালের পাশেই। -কোত্থেকে এসেছ? মেক্সিকো? নাহ, বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শুনেই সে আর এক বাংলাদেশি ছেলের গল্প বললো যে তাকে সেন্দাই স্টেশনে সিঁড়ি নামতে সাহায্য করেছিলেন। নাম বলতে পারলেন না কিন্তু অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে বাংলাদেশের নাম বললেন। গর্বে বুকটা ভরে গেল। স্যালুট মাই কান্ট্রিম্যান। – তোমার দেশের সব ছেলেই কি দয়ালু নাকি? জ্বি। আসলে পৃথিবীর সব ছেলেরাই দয়ালু। আমি মিররে দেখলাম, উনি মুচকি হাসলেন। একটু সহজ ও হলেন। তবে জাপানের সাথে একটু তফাৎ আছে। মেয়েদের প্রতি বেশি দয়ালু বলতে পারেন। পুরুষ মহিলা একসঙ্গে হাঁটলে ভারি লাগেজটা সাধারণত পুরুষটা বহন করে। বাসে ট্রেনে মহিলা দেখলে সাধারণত পুরুষরা সিট ছেড়ে দেয়। শুধু কি তাই? গত ৮ বছর পুরো দেশের শাসনভার আমরা মহিলাদের উপর ছেড়ে দিয়েছি। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আমরা জেন্ডার-ইকুয়ালিটি দেখিনা। উই রেস্পেক্ট মহিলা, উনাদের উচ্চাসনে রাখি। আবারো হাসলেন। বৃদ্ধ আর শিশুদের হাসি সবচেয়ে সুন্দর হয়। তবে এই হাসি বের করে নিতে হয়।

বেশিক্ষণ কথা হলোনা। এর মধ্যে উনার হাসপাতালে পৌঁছলাম। বাকি কথায় যা বুঝলাম – উনি রেগুলার চেক আপ করতে হাসপাতালে যান। বাড়িতে একা থাকেন। ছেলে মেয়েরা থাকে টোকিওতে। রেগুলার চেক আপ বলতে কিছু না। হাসপাতালে গেলে আরও কয়েকজনের সাথে দেখা হয়। নূতন বন্ধু ও তৈরি হয়। একাকিত্ব ভাল্লাগেনা। বৃদ্ধাশ্রম শব্দটা পছন্দ করেননা। বর্তমানে বৃদ্ধদের জনসংখ্যার ৮% লোক একা থাকেন। অন্য এক সামাজিক সমস্যা। খাবার সরঞ্জাম কিনার টাকা আছে, রাঁধতে পারছেন না। গাড়ি আছে, চালাতে পারছেন না। ব্যাঙ্কে টাকা আছে, ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট করতে পারছেন না। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও না খেয়ে মরছেন, এমন সংখ্যা ও কম নয়। বড় কথা একজন মানুষ মারা গেলে তা টের পাওয়ার ও লোক নেই। আইছ একা, যাইবা গো একা, সঙ্গে কেহ যাইবে না … কিন্তু মরার আগে শেষ কথা কাউকে বলে যাবেন শুনার লোক নেই। ফাঁসির আসামিকে ঝুলানোর আগে শেষ খাবার খাওয়ার, শেষ সাক্ষাত করার, শেষ কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়। একা একা মরার কষ্ট আমাদের জানার উপায় নেই । এই হল এইজিং সোসাইটির হাল। ডেনমার্ক, সুইডেনের মত দেশে বুড়ো লোক নিজ এপার্টমেন্টে মরে পড়ে থাকার ৬ মাস, ৩ বছর পর টের পেয়েছেন এমন ঘটনা ও আছে। আমরা ও শীঘ্রই এইজিং সোসাইটিতে পা দিতে যাচ্ছি। জাপানীরা টেক প্রিয় জাতি। কয়েকটি কোম্পানি গবেষণায় নেমে গেল- কিভাবে অসুস্থ রোগীকে কে রিমোট থেকে আর্লি ডিটেক্ট করা যায়।

প্যানাসনিক তাদের থার্মফ্লাক্সে একটা সেন্সর আর ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি দিয়ে দিলেন। আইডিয়াটা হলো – জাপানী বৃদ্ধরা ঘন ঘন গ্রিন চা খায়। চা খাওয়ার জন্য গরম পানি লাগবে। থার্মফ্লাস্কে পানি পাফ করতে গেলেই সিগনাল চলে যাবে ইন্টারনেটে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিগনাল না পেলে এলার্ট চলে যাবে তার রিমোট ডাক্তার, আর পরিবার সদস্যের কাছে। নিয়মিত সিগন্যাল পেলে ধরে নিবে বুড়ো সুস্থ আছেন। টোটো কোম্পানি টয়লেটের ফ্লাশ এ বসিয়ে দিলেন সেন্সর। একই উপায়ে রিমোট থেকে মনিটর করা সম্ভব। সুস্থ থাকলে টয়লেট ফ্লাশ করবেনই। কেউ কেউ ভিডিও ক্যামেরার আইডিয়া ও দিলেন। প্রাইভেসি নিয়ে কথা উঠল। এই আইডিয়া বেশিদুর এগুলো না।

৩। মরতেই যখন হবে, মরবেন কিভাবে :হুমায়ুন আহমেদের একটা নাটকের কথা মনে আছে? “একা একা”? [৩]। সম্ভবত ৮৬ সালের। দাদাজান “আবুল হায়াত” মারা যাবেন। কি এক পারিবারিক প্রস্তুতি। একান্নবর্তী পরিবার। ছেলে, বউ নাতি পুতি একবাড়িতেই আছেন। মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্ররা এসে কোরআন পড়ছেন। ছেলেমেয়েরা যার যার দায়িত্ব পালন করছেন। পাশের বাড়ির নিম্নবিত্ত পরিবারের বিনু “সুবর্না মুস্তাফা” একজন হোমকেয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। কি এক সাস্টেইনেবল সামাজিক দৃশ্য। আপনি কিভাবে মরতে চান? ভারতে হিন্দু ধর্মে বুড়োরা শেষ দিন গুলো পুণ্যস্থান বেনারসে কাটাতে পছন্দ করতেন। পাপুয়া নিউগিনিয়াতে একসময় এমন দৃশ্য ও ছিল। আপনি জীবনে পুণ্য কাজ করে থাকলে বৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে আপনাকে কেটে কুচি কুচি করে কমিউনিটির সবাই মিলে খেয়ে পুণ্যের ভাগ নিবে। আমি এখন যেখানে থাকি এটা ফুকুওকা শহরের পশ্চিমে একটা ছোট পেনিন্সুলা (উপদ্বীপ)। তিন দিকেই সমুদ্র। সমুদ্র ঘিরে রিসোর্ট হোটেল তৈরি করাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তৈরি হচ্ছে হাসপাতাল। নামে হাসপাতাল, কাজে বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রম শব্দটা পছন্দ না বলে নাম দিয়েছেন হোটেল। বুড়োরা শেষ দিন গুলো এখানে থাকতে আসেন। বৃদ্ধাশ্রম থুক্কু হোটেল কর্তৃপক্ষ উনাদের জন্য সকাল বিকাল শরীর চর্চা, মেডিক্যাল চেকআপ, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ট্যুর, আশেপাশে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার ট্যুর আয়োজন করেন। বিকালে সবাই মিলে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখেন। সকালে দেখেন সূর্যোদয়। সমুদ্র দেখতে দেখতে একদিন ওপারে বেড়াতে চলে যান।

পাতাটি ২২৯৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…

রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম



মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই চায় অল্প পুঁজিতে বা অল্পশ্রমে বেশি লাভ করতে। যে খানেই এক পন্যের সাথে আরেকটি পন্য ফ্রি পায় সেখানেই সবাই ভিড় জমায়। শুনেছি জাপানে একশ ইয়েন ফ্রি পেতে পাঁচশ ইয়েন খরচ করে হলেও তা সংগ্রহ করে থাকে। শুধু জাপানিজদের মধ্যে নয়, বরং আমাদের মুসলমানদের মধ্যেও এ প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। আমরা সামান্য আমল করেই জান্নাত হাতের মুঠোয় পেতে চাই। আর আল্লাহ মুসলমানদের এ মনোভাব বুঝতে পেরেই তার প্রিয় বান্দারে জন্য রমজান মাস দান করেছেন। কেন না রমজান মানেই কম আমলে বেশি সওয়াব লাভ করে জান্নাত লাভের সুব্যবস্থা।

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত: রমজান হিজরতের নবম চন্দ্রমাস। রমজান অর্থ আগুনে পুরে যাওয়া। উত্তপ্ত হওয়া। যেহেতু এ মাসেই রোযাদাররা ক্ষুধায় তৃষ্ণায় পুড়ে যায় এবং এ মাসে রোযাদারদের পাপ সমূহ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই এ মাসকে রমযান বলে নামকরণ করা হয়েছে। 11 মাসের অপবিত্রতা দূর করতেই মাহে রমজান মাসের আগমন ঘটে। এ মাস যারা পেল তারা সৌভাগ্যবান। এমাস পাওয়ার জন্য স্বয়ং নবী হযরত মোহাম্মদ(সা:) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। তাই আমাদেরও সেটা করা উচিত। এ বরকতময় মাসেই মহান আল্লাহ তার রাসূলগনের কাছে ওহী প্রেরণ করতেন। মহা গ্রন্থ আল কোরআন ও আসমানী অন্যান্য কিতাব সমূহ এমাসেই অবতীর্ন করেছেণ। তাই এ মাস হচ্ছে বরকতময় কারন 1. এ মাস ওহী নাযিলের মাস। 2.এমাসেই শয়তানকে শৃঙ্খলবদ্ধ করা হয়। 3. এ মাসেই বান্দার গুণাহ মাফ করে দেওয়া হয়। 4. এ মাস হচ্ছে কম পূজিতে বেশি লাভ করার মাস। এ মাসে প্রত্যেক আমলের সওয়াব 70গুণ বৃদ্ধি করা হয়। আর তাই এমাসে বেশি করে কোরআন তেলাওয়াত আর নফল এবাদত করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করতে হবে।

তারাবীর গুরুত্ব ও মহত্ব: রমজান মাসের সারাদিন রোযা রাখার পর রাত্রে তারাবীর নামায পড়ার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। তারাবীর নামায পড়ার হুকুম হল সুন্নতে মুয়াক্কাদা। যা পালন করা অপরিহার্য। বিনা ওযরে ছেড়ে দিলে অবশ্যই গুনাহগার হতে হবে। নবী হযরত মোহাম্মদ(সা:)থেকে শুরু করে সাহাবীগন ও তাবেঈন সালফে সালেহীন সকল যুগে ধারাবাহিকভাবে এর আমল অদ্যবদী চলে আসছে। এ অল্প সময়ের এবাদতের মাধ্যমে আললাহর সন্তষ্টি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। তাই আমাদের তারাবীর নামায পড়ার ক্ষেত্রে বেশি করে মনোযোগী হতে হবে। নবী (সা:)তারাবীর নামায সম্পর্কে বলেছেন,“ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের প্রত্যাশায় তারাবীর নামায আদায় করবে, আললাহপাক তার সারা জিন্দেগির গুনা মাফ করে দিবেন।” (মুত্তাফাক আলাইহ্)।

জানা অজানা:
1. শরীয়তের ওযর ব্যতীত রমযানের রোযা কখনোই পালন না করা বা ভাঙ্গা যাবে না।
2. রোযা অবস্থায় ভুলবশত কেউ যদি কিছু খেয়ে ফেলে বা স্ত্রী সহবাস করলেওে রোযা ভাঙবেনা। তবে স্বরণ হওয়া সাথে সাথে তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
3. অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে রোযা ভাঙবেনা। তবে বমি যদি পূর্নবার গিলে ফেলে তা হলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।
4. মুখের লালা বা থুতু যত বেশিই হোকনা কেন তা গিলে ফেললে রোয়া ভাঙবেনা।
5. গোসল ফরয হলে সেহেরী গ্রহনের পূর্বে গোসল করা আবশ্যক। তবে ভুলে গেলে রোযা নষ্ট হবে না। স্বপ্ন দোষে রোযার কোন ক্ষতি করে না।
6. রোযা অবস্থায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যে কোন ধরনের ইনজেকশন বা স্যালাইন গ্রহন করলে রোযা ভাঙবেনা।

লেখক: মুফতি হাবীব আহমাদ খান
ইমাম ও খতীব, কামাতা মসজিদ, জাপান
মুঠোফোন: 07069464832

পাতাটি ১৫৫০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…

জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ



ড. মীজানুর রহমান

বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থে যেভাবে বলা হয়েছে, ঠিক সেভাবে না বলে অর্থাৎ ধর্মের অপব্যাখ্যাবিষয়ক বিভিন্ন বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আর এই বইগুলোই জঙ্গিবাদকে অনুপ্রাণিত করছে। কেবল তাই নয়, এই জঙ্গিবাদ উত্থানের বড় কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। সমাজে অর্থনৈতিকসহ নানা কারণে একটি বঞ্চিত ও অবহেলিত শ্রেণি রয়েছে। এই বঞ্চিত শ্রেণিকে খুব সহজে ভয় এবং প্রলোভন দেখিয়ে বশ করা যায়। এ জন্য জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বিদ্যমান। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষারও কয়েকটি ভাগ দেখা যায়। আলিয়া মাদ্রাসাসহ কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সেখানে কী পড়ানো হয় এবং অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তেমন তদারকি দেখা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হয় তারা খুব ভালো চাকরি পায় না। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তেমন নেই। এতে তাদের মাঝে হতাশা কাজ করে। এক সময় মনে করা হতো, নানা দিক থেকে অধিকারবঞ্চিতরা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা গ্রহণ করছে আর তারাই জঙ্গিবাদের প্রধান একটি উৎস। কিন্তু এখন এর বিপরীত অবস্থা দেখা যাচ্ছে। কেবল সামাজিকভাবে বঞ্চিতরাই নয়, অনেক ধনী পরিবারের সন্তান, যাদের পিতামাতা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে তারাও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এর পেছনেও কারণ হলো সামাজিক ব্যভিচার, অত্যাচার এবং যথাযথ সামাজিকীকরণের অভাব। যখন কেউ বিরূপ পরিবেশের মধ্যে বড় হয়, তখন তার মাঝে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় উচ্চ সমাজের শিশুদের অধিকার এবং বাবা-মার আদর-যতœ থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়। মাদ্রাসায় পড়ার কারণে অনেকে ভালো চাকরি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মাদ্রাসাসহ ভুল শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজনের এ বিষয়টি বেশি লক্ষণীয়। সর্বোপরি উচ্চ ও নিম্নবিত্ত সমাজে নানা কারণে হতাশা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মূলত এই ক্ষোভ, হতাশা এবং সামাজিকভাবে বঞ্চিত একটি শ্রেণি থেকেই সুসংগঠিত জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরনো। যদিও বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশ ধর্মীয়ভাবে সহনশীল এবং আমরা কট্টর ধর্মীয় পন্থা গ্রহণ করি না। অর্থাৎ আমরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধতায় বিশ্বাসী নই। তারপরও রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষদিকে ধর্মের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করা হয়। হিন্দু এবং মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। এই দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তি করেই উপমহাদেশ বিভক্ত করা হয়। পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। পরে ভ্রান্ত পাকিস্তানকে সংশোধন করেই আমরা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু যারা পাকিস্তানি ভাবধারার ছিল, এখনো তাদের সে মানসিক একাত্মবোধ শেষ হয়নি। পাকিস্তানবাদ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলাম এবং সে চিন্তার সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত অবস্থা রয়েছে। আর এই বিপরীত অবস্থাকে ধারণ করে এমন লোক এখনো বাংলাদেশে আছে। সমগ্র জাতি মুক্তিযুুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলÑ এটা আসলে সঠিক বলা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকে আমাদের বিরোধিতা করেছিল। বিরোধিতা তখনো ছিল, এখনো আছে। এই বিরোধীগোষ্ঠীই পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

ইসলামকেন্দ্রিক ভাবাদর্শ ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে নানা আন্দোলনে বাংলাদেশের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। এ দেশ থেকে প্রচুর লোক আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন এবং কাশ্মির যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে তারা ফিরেও আসে। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নেটওয়ার্ক অবশ্যই আছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ফিরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হয়েছিল। এর মূল হোতারা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর ভক্ত ও অনুসারীরা। সামরিক ক্ষমতা থেকে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল তারাই এদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠপোষকতা করে। যেমন লিবিয়া এদের মূল আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। লিবিয়াই পৃথিবীর এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং অস্ত্র দেওয়ার কাজটি করে। কাজেই এসব মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ইতিহাস অনেক পুরনো। সব ধর্মে মৌলবাদী আছে। ইসলামি মৌলবাদীদের সঙ্গে ইসলামি বিশ্ব তথা আরব তথা মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ আছে। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, প্রত্যেক মৌলবাদী গোষ্ঠীর একটি উগ্র চর্চার ভূমি হচ্ছে ইউরোপ। এসব সংগঠনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু লন্ডন। লন্ডনে হিজবুত তাহরির থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠনের শাখা-প্রশাখা রয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা এবং দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বাংলাদেশে মুক্তমনা লোকজন ছিলেন। কিন্তু তারা লন্ডন ও বার্মিংহামসহ বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে এসে কট্টরপন্থি এবং মৌলবাদী ভাবধারায় জীবনযাপন শুরু করে। তাদের সবকিছুতেই ভয়াবহ পরিণতি লক্ষ করা যায়।

মানুষকে ভালো না বেসে, শান্তির বাণী না শুনিয়ে উগ্রপন্থা অবলম্বন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব হাজির করা যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু লোক তার নিজস্ব মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ মতাদর্শ বলে মনে করে। কিন্তু সাময়িকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা যেতে পারে, দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। ইতিহাসের বিচারে কোনো সত্যই চিরন্তন নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে। মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধিবোধ থাকতে হবে। জোর করে মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার সব প্রচেষ্টা ইতিহাসে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কিনা তা দেখতে হবে। আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এখনো পুলিশের ওপর আস্থা হারায়নি। কিন্তু সমস্যা হলো জনবহুল দেশের পুলিশ জনসংখ্যা অনুপাতের তুলনায় অনেক কম। আমাদের পুলিশের সংখ্যা এবং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুরনো সব ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঝে আধুনিক জ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, পরিবহন ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পুলিশের বেতন-ভাতাসহ নানা সুবিধাদি বাড়ানো দরকার। অর্থাৎ আধুনিক বাহিনী গঠন করার জন্য যা যা দরকার তার সব ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়নি। হত্যাকারীদের বলা হয়েছিল, সাদা চামড়ার লোক হলেই হলো। তারা ইতালি, জাপানি আর ইউরোপের হোক তাতে কোনো যায় আসে না। এই বিদেশিরা হলেন নিষ্পাপ ভুক্তভোগী। বিদেশি হত্যার উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে হেয়প্রতিপন্ন করা। কিন্তু হঠাৎ করে একটি ঘটনা ঘটিয়ে কেবল তাৎক্ষণিক প্রচারণা পাওয়া যায়, দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। তবে এসব ঘটনাও থেমে যাবে। কারণ বিদেশি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ কথা ঠিক যে, মতাদর্শগত কারণেই জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এই জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ দরকার। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য প্রতিরোধ শক্তির কোনো বিকল্প নেই। বুলগেরিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার বক্তব্য ছিল, সন্ত্রাসীদের উৎস কোথায়? তারা কোথা থেকে আসে? আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপ করার লোকটিই বা কে? তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপকারীদের অধিকাংশ গরিব এবং ছিন্নমূল। এরা এতিমখানায় লালিত-পালিত। এদের সঙ্গে পরিবার তথা মা-বাবার কোনো সম্পর্ক নেই। মগজ ধোলাই করে তাদের এমন কাজে অনুপ্রাণিত করা হয়। তাদের বলা হয়, আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে সে সহজে বেহেশতে যাবে। আর বেহেশতে গেলেই সুখের শেষ নেই। এসব অনুপ্রেরণায় তারা বোমা নিক্ষেপের প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু তাদের পরিবার, বাবা-মা থাকলে বশ করা যেত না। এই কাজ করার আগে তাদের মাথায় পরিবারের চিন্তা আসত। এ কাজের জন্য তার মা-বাবার কী হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে পথশিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। বাবা-মা হারানোসহ নানা কারণে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এসব শিশুর অধিকাংশেরই এতিমখানায় স্থান হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশে এতিমখানাগুলো ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর দখলে। এতিমখানায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নেই। এতিমখানা মানেই হচ্ছে হাফেজিয়া অথবা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা। এতিম শিশুদের রাষ্ট্র কর্তৃক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা হলে জঙ্গিবাদ তথা মৌলবাদী সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে। মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে বঞ্চনাবোধ কমে আসবে। এ ছাড়া একজন মানুষ যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল হয় তাহলে তাকে কোনোভাবেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। কাজেই পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য শিশুর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত জীবনযাপনের অধিকার সংরক্ষণ করা উচিত।

সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদ। ইসলামি ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন যাবৎ ইমাম প্রশিক্ষণ নামে একটি কর্মসূচি চালাচ্ছে। কিন্তু তার পরও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাইকে বিভিন্ন ওয়াজ নসিয়ত শোনা যায়। যেগুলো অনেকটাই এ জঙ্গিবাদকে উসকে দেয়। এখানে প্রায়ই শোনা যায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথা। অনুভূতি হলো বিশ্বাসের একটি প্রাথমিক পর্যায়। কতকগুলো ধাপ অতিক্রম করে সর্বশেষ হলো মানুষের বিশ্বাস। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনুভূতি হলো সেন্সেশন। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেমনÑ আল্লাহর কোনো আকার নেই, এটি আমার দৃঢ়বিশ্বাস। যদি কেউ বলে আল্লাহর আকার আছে, তাকে দেখা যায়। এ অবস্থায় যেহেতু আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ নিরাকার, তাকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই এ কথা আমার অনুভূতিতে লাগার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, যাদের বিশ্বাস দুর্বল তাদের অনুভূতি বেশি সূক্ষ্ম থাকে। যাদের বিশ্বাস যত বেশি দৃঢ় তাদের অনুভূতিও ততটা কার্যকর থাকে না। যারা অনুভূতিতে আঘাতের নামে মানুষকে মারতে আসে তাদের বিশ্বাসে সমস্যা রয়েছে। বেহেশত পাওয়ার জন্য আত্মঘাতী বোমা মারা সম্পূর্ণরূপে কোরআনে নিষিদ্ধ। এসব কাজের মাধ্যমে বেহেশত পাওয়া তো দূরের কথা উল্টো সে দোজখে যাবে। একজন মানুষ হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। মদিনা সনদ এবং বিদায় হজের ভাষণে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সব ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত এবং নানাধর্মের মানুষদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি জীবনবিধান সব ধরনের সন্ত্রাসকে হারাম ঘোষণা করেছে। এসব কথা যদি মসজিদের ইমামরা খুতবার সময় বলেন তাহলে মানুষ সচেতন হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমামদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যাতে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের মতো জাতীয় কর্মকা-ে ভূমিকা রাখতে পারেন। এর বিপরীতে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে ইমামরা যাতে উগ্রবাদী কথাবার্তা তথা সন্ত্রাসী কর্মকা- উসকে না দেন সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির নজর রাখতে হবে। সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, ব্যভিচার, রাহাজানি, সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিবাদসহ সব অপকর্ম দূর করার লক্ষ্যে ইমামদের উচিত মানুষকে ভালো কথা বলা, সুপথে পরিচালিত করা। নতুন প্রজন্ম সচেতন, তারা মৌলভীদের অপব্যাখায় কান দেবে না। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের বয়স্ক শিক্ষাহীন ব্যক্তিরা মৌলভীদের কথায় বেশি বিশ্বাস করে। এমনটি না করে মৌলভীরা যদি জামায়াতে ইসলাম কায়েম করতে চানÑ তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিটি মসজিদে কমিটি গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কেবল বাইরে রাজনীতি করলেই হবে না বরং মসজিদে গিয়ে শোনা উচিত মৌলভী সাহেব সঠিক কথা বলেন কিনা। মৌলভীরা যাতে ধর্মভীরু লোকদের বিভ্রান্ত করতে না পারেনÑ সেদিকে নজর রাখতে হবে। মসজিদের মাইক ব্যবহারে নির্দেশনা থাকা উচিত। কেবল আজান দেওয়া ছাড়া মসজিদের মাইক আর কোনো কাজে লাগানো যাবে না। কেননা আমরা দেখেছি, চাঁদে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দেখা যাচ্ছে, এমন ঘোষণা প্রথমে মসজিদের মাইক থেকে দেওয়া হয়েছিল। আর এর মাধ্যমে সমাজের গরিব, নিরীহ মানুষের ক্ষতি করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের সমাজের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান থেকে জঙ্গিবাদ দমনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে, সভ্যতা কখনো পেছনের দিকে যাবে না, শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সভ্যতা সামনের দিকে অগ্রসর হবে। জঙ্গিদের যাবতীয় কর্মকা-ের মূল লক্ষ্য হলো দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়া, তা কখনোই সম্ভবপর হবে না।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পাতাটি ১৩১৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…

পথ চলার বিশ্বস্ত বন্ধু টয়োটা



এইচ এম দুলাল::

পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সৃজনশীলতা এই তিনকে একবিন্দুতে মিলিত করতে পারলে যে কোনো অবস্থান থেকেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এই মূলমন্ত্র ধারণ করেই পৃথিবীতে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাকিচি তয়োদা। চারদিকে যখন অর্থনৈতিক মন্দা ঠিক তখন অন্যদের মতো হতাশ না হয়ে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সামান্য তাঁতি থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন টয়োটা কোম্পানির মালিক হিসেবে। এখন টয়োটা বিশ্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত একটি গাড়ি নির্মাণ ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান। সাকিচি তয়োদা এবং টয়োটা কোম্পানির গাড়ির আদ্যোপান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে শুরু হলো আমাদের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন “পথ চলায় বিশ্বস্ত বন্ধু
টয়োটা”

তাঁতি থেকে টয়োটার মালিক: বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর করপোরেশন। টয়োটা শব্দটি এসেছে কোম্পানি মালিকদের উদ্ভাবকদের রাজা খ্যাত সাকিচি তয়োদার নাম থেকে। সাকিচি তয়োদা জন্মগ্রহণ করেন ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৭ সালে। সাকিচি গরিব তাঁতির ঘরে জন্মেছিলেন বটে, কিন্তু কঠিন বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে সফল হয়েছেন। তৎকালীন জাপানের নাগোয়ার দক্ষিণ-পূর্বে মধ্য-দক্ষিণ হনসু অঞ্চলে কোরোমো নামের একটি শহর ছিল। শহরের বাসিন্দাদের হাতে চালানো তাঁতে খুবই ধীরগতিতে রেশম গুটি থেকে তৈরি হতো রেশমি কাপড়। একদিকে কম কাপড় বুনন অপরদিকে দেশ-বিদেশে কাপড়ের চাহিদা কমায় বাসিন্দাদের আর্থিক অসঙ্গতিতে ফেলে দেয়। এমন সময় ওই শহরের বাসিন্দা সাকিচি তয়োদা চুপচাপ বসে আর্থিক অবনতির পরিস্থিতি দেখতে নারাজ। তখন তিনি মনোনিবেশ করেন যন্ত্রচালিত তাঁত উদ্ভাবনের দিকে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তিনি সফল হলেন। আধুনিক এ যন্ত্রের ব্যবহার করলেন নিজের কাজে। মেশিনের সাহায্যে আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে কাজ হতে লাগল। কাপড়ও বেশি বুনন হলো। এ কাজে দুটো পয়সার মুখ দেখতে শুরু করলেন তিনি। তখন নিজেদের অভাব ঘোচাতে যন্ত্রচালিত তাঁত যেন আশার আলো জুগিয়েছিল। কাজের সফলতায় নতুন কিছু উদ্ভাবনে তিনি আরও বেশি উৎসাহী হলেন। এ উৎসাহ আরও বেড়ে যায় তার তয়োদা অটোমেটিক লুম কোম্পানি উদ্ভাবিত একটি মেশিনের প্যাটেন্ট ১০ লাখ ইয়েনে বিক্রি করার সুযোগ পেয়ে। মেশিনটির উপযোগিতা বিবেচনা করে ক্রয় করেছিল ব্রিটেনের প্ল্যাট ব্রাদার্স। সে সময়ে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণের ওই অর্থ সাকিচি তয়োদা বিনিয়োগ করেন গাড়ির ইঞ্জিন বানানোর কাজে। নতুন উদ্ভাবনী কাজের দায়িত্ব দেন নিজের ছেলে কিচিরো তয়োদাকে। ১৯৩৫ সালে প্রথমবারের মতো জে-ওয়ান মডেলের গাড়ির ইঞ্জিন উদ্ভাবনে সক্ষম হন কিচিরো তয়োদা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তয়োদা পরিবারকে। আনুষ্ঠানিকভাবে তয়োদা মোটর কোম্পানি লিমিটেডের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ আগস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উচ্চারণ সুবিধার বিবেচনায় তয়োদা শব্দটিকে পাল্টে করা হয় টয়োটা। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর করপোরেশনের সদর দফতর জাপানের টয়োটা সিটিতে। পরবর্তীতে সাকিচি তয়োদাকে ‘কিং অব জাপানিজ ইনভেনটর’-এর খ্যাতি প্রদান করা হয়। ১৯৫৯ সালে সাকিচির শহরের নাম পাল্টে রাখা হয় টয়োটা সিটি।

সাকিচি তয়োদার মূলমন্ত্র:
♦ সব সময় নিজ দায়িত্ব এবং কোম্পানির প্রতি অবদান রাখতে বিশ্বস্ত হতে হবে
♦ অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সদাপ্রস্তুত থাকতে হবে
♦ বাস্তবমুখী চিন্তা করার পাশাপাশি অস্থিরতা পরিত্যাগ করতে হবে
♦ কর্মক্ষেত্রে ঘরোয়া পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে
♦ সর্বদা সৃষ্টির রহস্যে বিশ্বাস স্থাপন করে আনুগত্য স্বীকার করতে হবে
বর্তমানে টয়োটা গ্রুপ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম গ্রুপ অব কোম্পানিজ। টয়োটা কোম্পানি সিডান, এসইউভি, হালকা ট্রাক প্রভৃতি শ্রেণির গাড়ি নির্মাণ করে আসছে। কোম্পানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটি ২০০ মিলিয়ন যানবাহন প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে টয়োটার কারখানা। এই টয়োটা কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়েছিল সাকিচি তয়োদার হাত ধরে। যিনি এক সামান্য তাঁতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজ মেধা আর সৃজনশীলতার ফলে টয়োটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সাকিচি তয়োদা ছিলেন কসাই-সিজুওকা দরিদ্র তাঁতি পরিবারের সন্তান। তার প্রথম যন্ত্রচালিত তাঁতের আবিষ্কারের সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠা পায় টয়োটা গ্রুপ। জাপানের মেশিন ইন্ডাস্ট্রির বড় ধরনের উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে অগ্রগামী ভূমিকা রাখে। ১৮৯০ সালে সাকিচি তয়োদা কাঠের হস্তচালিত তাঁতের আবিষ্কার করেন। এর ছয় বছর পর কাঠ ও লোহা দিয়ে তৈরি করেন পাওয়ার লুম। ১৮৯৭ সালে পাওয়ার লুম দিয়ে সুতি কাপড় তৈরিতে সফল হন। ১৯০২ সালে পাওয়ার লুম দিয়ে কাপড় তৈরি একটি লাভজনক পর্যায়ে আসে। ১৯১০ সালে তার আবিষ্কৃত মেশিন আমেরিকা ও ইউরোপের নজর কাড়ে। সেসব দেশে এই পাওয়ার লুমের চাহিদা তৈরি হয়। অসামান্য এই আবিষ্কারের সফলতা হিসেবে ১৯১২ সালে জাপানি সরকারের পক্ষ থেকে ব্লু রিবনের সম্মানী মেডেল দেওয়া হয় সাকিচি তয়োদাকে। পাওয়ার লুমের কার্যকারিতা ও অবদানের গুরুত্ব বিচারে ১৯২৪ সালে আবারও একই পুরস্কার পান। এরই মধ্যে সাকিচির অর্জিত অর্থের পরিমাণও আসে একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে। নিজের অর্থ থেকে তিনি ১৯২৫ সালে ‘ইমপেরিয়াল অব ইনভেনশান অ্যান্ড ইনোভেশান’কে ১ কোটি ইয়েন দান করেন। ১৯২৬ সালে এখান থেকে তাকে একটি স্মারক দেওয়া হয়। ১৯২৯ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রাদার্স অ্যান্ড কোং-এর কাছে ১০ লাখ ডলারে অটোমেটিক লুমের প্যাটেন্ট হস্তান্তর করেন। ১৯৩০ সালে মারা যাওয়ার পর তিনি জুনিয়র গ্রেড অব দ্য ফিফথ মরণোত্তর পুরস্কার পান। জাপানি সরকারের পক্ষ থেকে তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৩৩ সালে তয়োদা অটোমেটিক লুম ওয়ার্কসের একটি বিভাগ হিসেবে টয়োটা অটোমোবাইল যাত্রা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সাকিচির ছেলে কিচিরো টয়োডা জি-১ মডেলের কার আবিষ্কার করেন ১৯৩৫ সালে। ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাবলিক কোম্পানি হিসেবে নতুন লোগো ধারণ করে যাত্রা শুরু করে। এ সময় তাদের ২৭ হাজার শেয়ারহোল্ডার ছিল। তারপর টয়োটা মটোর কোং স্বায়ত্তশাসিত কোম্পানিতে পরিণত হয় ১৯৩৭ সালে।
সেরা হওয়ার গল্প
নিজ দেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টয়োটার কারখানা রয়েছে। ১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো বিদেশে গাড়ি বিক্রি শুরু করে এ কোম্পানি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের মধ্য দিয়ে টয়োটা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে। ২০০৮ সালে পৃথিবীর গাড়ি বাজারের ৩২ শতাংশ টয়োটা গাড়ি দখল করতে সক্ষম হয়। ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো জাপানের বাইরে ব্রাজিলে গাড়ির কারখানা স্থাপন করে। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে জাপানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের নিজস্ব ১২টি কারখানা, ১১টি সাবসিডিয়ারি অ্যাফিলিয়েট কারখানা ছাড়াও বিশ্বের ২৬টি দেশে মোট ৫১টি কারখানা রয়েছে। এগুলোতে গড়ে প্রতি বছর ৫৫ লাখ গাড়ি তৈরি হয়। অর্থাৎ প্রতি ৬ সেকেন্ডে তৈরি হয় একটি করে টয়োটা গাড়ি। অবাক করার মতো হলেও সত্যি যে বিশ্বের প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে টয়োটা গাড়ি বিক্রিও হচ্ছে। কোম্পানিটির জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত মোট তিন কোটি ৭৫ লাখেরও বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে। ৪০ বছর ধরে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে গাড়ি বিক্রি করে আসছে কোম্পানিটি। টয়োটা গাড়ির জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়ায় এই গাড়ির এত বেশি জনপ্রিয়তা। এ ছাড়াও টয়োটা গাড়ির কাঠামোগত এবং সৌন্দর্যগত দিক। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে তৈরি হয় টয়োটা। যেমন— জাপান, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ইত্যাদি। টয়োটা গাড়ির জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর টয়োটার উন্নত চার সিলিন্ডারের ইঞ্জিন সংযোজন টয়োটা গাড়িতে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই ইঞ্জিনই টয়োটাকে আজকের শীর্ষ অবস্থান এনে দিয়েছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত শুধু জাপানেই টয়োটা কোম্পানিতে চাকরি করছে ৭০ হাজার লোক। সারা বিশ্বে উৎপাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৭৭ জন। ২০১১ সালে জেনারেল মোটরস এবং ভক্সওয়াগন গ্রুপকে পেছনে ফেলে উৎপাদনের দিক দিয়ে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ি প্রস্তুতকারক হয়ে গড়ে উঠেছে। উপার্জনের দিক দিয়ে বর্তমানে টয়োটা পৃথিবীর এগারতম বৃহত্তম কোম্পানি। ১৯৬৪ সাল নাগাদ প্রতি বছর টয়োটার বার্ষিক গাড়ি বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৪ লাখ ৬৪ হাজার। ২০১৫ সালে টয়োটা সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে ১০ মিলিয়ন গাড়ি বিক্রি করে। বর্তমানে কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ ৬৩৫ বিলিয়ন ইয়েন। এর আগে ফোর্ডের এফ সিরিজের ট্রাক ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিক্রিত গাড়ি। কিন্তু একে পেছনে ফেলে সর্বকালের সেরা বিক্রিত গাড়ির তালিকায় উঠে এসেছে টয়োটা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
যানবাহনের নিরাপত্তাকে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। এগুলোর একটি হচ্ছে সক্রিয় নিরাপত্তা। এটি নজর দেয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দিকে। অন্যটি হচ্ছে পরোক্ষ নিরাপত্তা যা সংঘর্ষকালে গাড়ির আরোহীদের রক্ষা করে। এ দুটি ক্ষেত্রেই টয়োটা আধুনিক প্রযুক্তির রেকর্ডধারী। যেমন— গাড়ির স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ বা ভেহিক্যাল স্ট্যাবিলিটি কন্ট্রোল চাকার এদিক-ওদিকে ফসকে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া সাসটেইনেবল রেসট্রেইন্ট সিস্টেম তাত্ক্ষণিকভাবে বেলুনের মতো ফুলে মাথাকে রক্ষা করে। এসব বিষয় ছাড়াও টয়োটা ইঞ্জিন, ব্রেক, স্টিয়ারিং এবং অন্যসব নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করে তৈরি করেছে ভেহিক্যাল ডায়নামিক ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। এর মাধ্যমে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত গাড়িকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। টয়োটা সংঘর্ষ পূর্ববর্তী নিরাপত্তা নামে এক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করবে ক্যামেরা ও রাডার প্রযুক্তি। এটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনার পূর্বাভাস দেবে। সম্ভাব্য পরিণতি ঠেকাতে অথবা সংঘর্ষের সময় চালককে কৌশলী করে তুলবে। কোম্পানির নতুন প্রেসিডেন্ট কাতসুয়াকি ওয়াতানাবির চিন্তাভাবনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে গাড়িতে হয়তো তন্দ্রা প্রতিরোধক সিস্টেমও উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। এর ফলে দীর্ঘ ভ্রমণকালে আরোহীর তন্দ্রা ভাব কাটানো যাবে। এমনকি মদপান করে গাড়ি চালানো প্রতিরোধের পন্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। এতে মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি গাড়ি চালকের আসনে বসলে গাড়ি চলবে না অথবা নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। তয়োদা গাড়ি নিয়ে ওয়াতানাবির ভবিষ্যৎ ভাবনা এখানেই থেমে নেই। তার স্বপ্ন এমন একটি আদর্শ গাড়ি তৈরি, যা প্রতিবারই চালানোর সময় বায়ু পরিশোধন করবে। আরও উৎসাহী হয়ে তিনি বলেন, ‘এমন একটি গাড়ি যা দুর্ঘটনা ও আঘাতকে একই সঙ্গে প্রতিরোধ করার মধ্য দিয়ে মানসিক চাপ কমাবে। ’
বৈচিত্র্যময় টয়োটা গাড়ি

বৈচিত্র্যতার দিক দিয়ে টয়োটা গাড়ির কদর বিশ্বজুড়ে। আট দরজার সাত হাজার ৯৬৩ পাউন্ডের এক দৈত্যাকার পিকআপ রয়েছে টয়োটা কোম্পানির। টয়োটা টুন্ড্রা ১৭৯৪ এডিশন ৪৪ ক্রিউম্যাক্সের পিকআপটি লম্বায় ২৬ ফুট এবং ভিতরে যাত্রী সিট রয়েছে নয়টি। তাই টয়োটা একে ডাকছে ‘টুন্ড্রাজিন’ যার অর্থ দাঁড়ায় টুন্ড্রা ও লিমুজিনের সংমিশ্রণ। এ রকম অদ্ভূত লিমুজিন এর আগে দেখা যায়নি। উচ্চতা ও প্রশস্ততা সাধারণ হলেও গাড়ির টায়ারগুলো বিশাল, যা প্রায় ৯০ দশমিক ২ ইঞ্চি করে। গাড়িটিতে আছে ৫ দশমিক ৭ লিটার ভিএইট ইঞ্জিন এবং তৈরি হয়েছে টেক্সাসের স্যান অ্যান্তোনিয়োতে। এদিকে পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় বিলাসবহুল দামি গাড়ির ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ঈর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে টয়োটা মোটরসের লেক্সাস সিরিজের গাড়িগুলো। এর মধ্যে এনএক্স মডেলের ছোট এসইউভি গাড়িটি বাজারে বর্তমানে বেশি জনপ্রিয়। গাড়িটির মূল্য ৩৫ হাজার ৪০৫ ডলার। ২০০০-২০১০ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে লাক্সারি অটো ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এক নম্বরে ছিল লেক্সাস। বর্তমানেও গোটা বিশ্বে রয়েছে এই লেক্সাসের ব্যাপক চাহিদা। তবে টয়োটার রয়েছে খুবই উচ্চমূল্যের কিছু গাড়ি। তার মধ্যে ১৯৯৮ সালের জিটি ওয়ান রোড ভার্শনের গাড়িটি অন্যতম। ৯২০ কেজি ওজনের গাড়িটি খুবই দৃষ্টিনন্দন ও চিত্তাকর্ষক। জিটি ওয়ান রোড ভার্শনের বাজার মূল্য ১৩ লাখ ডলার। টয়োটা কোম্পানির ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার মূল্যের আরও একটি দামি বিলাসবহুল গাড়ি হচ্ছে টয়োটা ২০০০ জিটি। গাড়িটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার। টয়োটা সেঞ্চুরি হচ্ছে টয়োটা কোম্পানির আরও একটি দামি মডেলের গাড়ি। ১ হাজার ৯৯০ কেজি ওজনের এই গাড়িটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার। টয়োটার যেমন রয়েছে বিলাসবহুল দামি গাড়ি তেমনি রয়েছে তুলনামূলক সস্তা মডেলের গাড়ি। এগুলোও কম জনপ্রিয় নয়। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত গাড়ির আন্তর্জাতিক বাজার দাপিয়ে বেড়িয়েছে টয়োটা স্টারলেট। পরবর্তীতে টয়োটা স্টারলেটের পরিবর্তে বাজারে আসে টয়োটা ইয়ারিস। দামে সস্তা গাড়ি হচ্ছে টয়োটা ইয়ারিস। ১৯৯৯ সালে প্রথম বাজারে আসে গাড়িটি। চার সিলিন্ডারবিশিষ্ট গাড়িটি ১০৬ হর্সপাওয়ার জেনারেট করতে পারে। এর মূল্য মাত্র ১৪ হাজার ৮৯৫ ডলার। দামে সস্তা হলেও গাড়িটিতে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। যেমন— এয়ার ব্যাগস সুবিধা, এয়ার কন্ডিশন সুবিধা, পাউয়ার উইন্ডোজ সুবিধা ইত্যাদি। ২০১৭ সালে টয়োটা ইয়ারিসের পাঁচটি মডেল আছে। এগুলো হচ্ছে— থ্রি-ডোর এল, থ্রি-ডোর এলই, ফাইভ-ডোর এল, ফাইভ-ডোর এলই, ফাইভ ডোর এসই। টয়োটা করোলা এই কোম্পানির আরও একটি সস্তা মডেলের গাড়ি। এই গাড়ির মূল্য মাত্র ১৭ হাজার ৩০০ ডলার।
বাংলাদেশে টয়োটাপ্রীতি
স্বাধীনতার পর ঢাকার রাস্তায় অধিকাংশ ছিল টয়োটা (পাবলিকা), ডাইহাটসু, কিছু ছিল ভক্সওয়াগন আর নিশান। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের প্রাইভেট গাড়ির বাজার প্রায় একচেটিয়াভাবে দখল করে নেয় টয়োটা। এত বেশি টয়োটাপ্রীতির কারণ টয়োটার স্পেয়ার পার্টসের দাম কম ও সহজলভ্যতা। আর দেশের যে কোনো জায়গায় মেরামতের সুবিধা পাওয়া যায়। তবে জনপ্রিয়তার আরও একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো টয়োটা গাড়ির রিসেল ভ্যালু। এ ছাড়া বাংলাদেশে সব সুবিধাসম্পন্ন একটি সেডান কিনতে গেলে ক্রেতার প্রথম পছন্দ থাকে টয়োটা মডেলের সেডান। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেডানগুলোর তালিকায় রয়েছে টয়োটা প্রিমিও, টয়োটা অ্যালিওন এবং টয়োটা অ্যাক্সিও। টয়োটা অ্যালিওন এবং টয়োটা প্রিমিও প্রথম বাজারে আসে ২০০১ সালে। তবে ১৯৭০ থেকে টয়োটা অ্যালিওন বাজারে আসে।

টয়োটা শুরু থেকেই বিশ্বের অনেক দেশে বেশ জনপ্রিয়, আর সম্প্রতি বাংলাদেশের বাজারেও এই কারের ব্যবহার বা আধিপত্য বেড়েই চলেছে। গ্লোবালাইজেশন, বিজ্ঞাপনের যুদ্ধে বাংলাদেশে সম্প্রতি এই কোম্পানীটির গাড়ি ক্রেতারা হাতে পাওয়ার জন্য দাম ছাড়াও সব ধরনের দায়িত্ব বহন করছে। টয়োটা তৈরী করছে উন্নতমানের ফ্যামিলি কার, গ্যাস মাইলেজ নাম্বারের এর কার, ট্র্যাক জাতীয় রানার এবং সিটি রাস্তার জন্য এমনকি স্পোটিকার, পারফেক্ট কান্ট্রিসাইড রাস্তার জন্য। একটা বড় ধরনের জনপ্রিয় কোম্পানী আছে যা বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য তৈরী, যা সাধরাণত খুব কম বাছাইয়ের সুযোগ থাকে যখন পুরাতন গাড়ি কেনার জন্য আসে।বাংলাদেশের মার্কেটে টয়োটা বিজ্ঞাপনের জন্য অনুমতি নেয়া এবং বলতে গেলে প্রায় সব মডেলের গাড়ি সফলতার সাথে বিক্রয় করে তারা। নতুন থেকে শুরু করে পুরানো গাড়ির ডিলারশিপ পর্যন্ত ক্লাসিফাইড, টয়োটা মডেলের গাড়ি খুব সহজেই পুরানো কার এর বাজারে পাওয়া যায়। এই কোম্পানীর হঠাৎ করেই একটি ভালো কাজ লক্ষ্য করা যায় অ্যাডর্ভাটাইজিং এর ক্যাম্পেইন বিভিন্ন এলাকায়, যা বড় ধরনেরও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এর খোজ পাওয়ার জন্য উপকারী। টয়োটা খুব তাড়াতাড়িই বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, কিন্তু এটি হঠাৎ করেই তাদের মার্কেট ছেড়ে যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে টয়োটার অনেক বড় ভক্তরা আছে। নানা প্রকারের উদ্দেশ্য এবং নির্ভরযোগ্যতার জন্য টয়োটার গুণের যেন শেষ নেই। টয়োটা গাড়ির মধ্যে বলা হয় সত্যিকারের বস এবং অনান্য যানবাহনের মধ্যে বেশ নাম রয়েছে তার দেশজুড়ে। যদি বাংলাদেশের নাগরিকরা একটি ব্র্যান্ড নিউ কার জন্য চোখ রাখে বা পুরানো কারের জন্য। তাহলে মার্কেটে সবার আগে টয়োটের নামই বেশি আসবে। টয়্টো যানবাহনের জন্য মাল্টিফিচারের কোম্পানী যা সবার জন্য জরুরী। রানার ট্র্যাক শক্ত জমির জন্য বেশ সুবিধার এবং দেশের বাইরে সিটি ট্র্যাফিক এলাকাতে টয়োটার দ্রুতগতির স্পোর্টস কার এর জুড়ি নেই। টয়োটা বলতে গেলে এমনকিছু যা সবার জন্য।তাদের জনপ্রিয়তা, শুধু তাদের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিভিন্ন সেটিংস এর দিক থেকেও বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয় কার হিসেবে বিবেচিত এটি। যা পরিবর্তনশীল ভুমির জন্য এবং খারাপ ভুমির জন্যও ভালো পরিচিত। টয়োটা ব্র্যান্ড বাংলাদেশের জন্য উত্তম জায়গা।

অনান্য বিশ্বের দেশগুলোর মত, বাংলাদেশে নানাভাবে এই যানবাহন আসার কোন উপায় নেই। আর এই ধরন, মডেল এবং বয়স বেশি দিনের না এবং অনেক মানুষ অনেক পুরানো কার ছেড়ে দিচ্ছে যে কোন সময়। আর এই সব পুরানো গাড়ি খুব বেশি তাদের কাছেও নেই। সাধারণত কোন ব্র্যান্ডের মডেলর গাড়ি না এবং খুব বেশি রং এর গাড়ি পছন্দ করার সুযোগ ছিল না, লাল এবং গ্রে রং এর গাড়ি এর মধ্যে বেশি জনপ্রিয়। টয়োটা বাংলাদেশি নাগরিকের পছন্দেও ধরণ পরিবর্তন করছে তাদের কার বাজারে এনে। টয়োটা খুব তাড়াতাড়ি মার্কেটে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনেকটা লিডারের মত কারণ তারা বাংলাদেশি মানুষদের বিভিন্ন ধরনের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা মানুষের সুখের জন্য কমের মধ্যে ভালো কিছু দিচ্ছে। টয়োটা বাংলাদেশি মানুষদের এই কার ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন অপশন এর গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে যা অনেকের স্বপ্ন ছিল। যা হয়তো আগের সময়ের কোন বড় লোকদের সুযোগ ছিল।

এটা খুবই স্বাভাবিক যে জীবনে অনেক সময় বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন মার্কেটে প্রোডাক্টের চাহিদা অনুযায়ি, মানুষের চাহিদা অনুযায়ি নির্ভর করতে হয় অনেকটা আবহওয়ার মত। টয়োটা খুব হাতের কাছে থাকা ্উপযুক্ত অপশন যা ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রির জন্য লিডার হিসেবে কাছে আসছে। এই ব্র্যান্ডটি শেষ কিছু বছরে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তৈরী করা হচ্ছে। বাংলাদেশের গরম, শুষ্ক মৌসুমের জন্য বিভিন্ন পরিবেশে এবং স্পেশালি বাংলাদেশে পরিবেশে সাথে মিল রেখে তৈরী করা হচ্ছে। টয়োটা আরো বেশি উন্নত জোনে বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়ার সাথে উপযুক্ত কেয়ার ও মেইনটেইন্স নিয়ে তৈরী করা হচ্ছে। অন্যদিকে, টয়োটা যে কোন রেইনি আবহাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের যানবহন লম্বা সময় ধরে তৈরী করে আসছে। এটা বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য আরো বেশি উপযুক্ত কারণ এই দেশে বসবাসের জন্য ক্যারিয়ার এর উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি ব্যবহার করতে হয়। একটি মাঝারি ধরেনর টয়োটা এ দেশে একটি ছোট পরিবারের জন্য অনেককিছু। এটা তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় পরিবারের মত করে পিতা-মাতার জন্য এবং ফুয়েল এর দামের জন্য, এমনকি ড্রাইভিং এর জন্য বেস্ট।

টয়োটা এবং তাদের যানবাহন বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্যে তৈরী করে, কিন্তু তারা বাংলাদেশি বাজারের জন্য নিজেদের সেভাবে বুঝে শুনে তুলে ধরেছে। আর কোম্পানী হিসেবে টয়োটা বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গাড়ি কোম্পানী। অনান্য যৌথ ব্র্যান্ডের তুলনায় এই দেশের রাস্তায় সবচেয়ে বেশি টয়োটা গাড়ি চলে। বিশেষ করে করোলা, টয়োটা কোম্পানীর সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম্বারের গাড়ি। এখানে হাজার ধরনের করোলা আমাদের দেশের রাস্তায় দেখা যায়, তাও ২০ থেকে ২৫ বছর এর পুরানো। অনান্য মডেলের মধ্যে বাংলাদেশে জনপ্রিয় অ্যালিয়ন, প্রিমিও এবং নোয়া। এই মডেল দেশ থেকে দেশে বিভিন্ন ধরনের নাম বহন করে কিন্তু তারা সাধারণত একই রকম পার্টস দিয়ে তৈরী, বডির ধরণ এবং এমনকি ইঞ্জিনও। যদি দ্রুত ইন্টারনেটে জনপ্রিয় গাড়ি খোঁজার জন্য বলা হয় তাহলে বাংলাদেশে একমাত্র টয়োটা ব্র্যান্ডের গাড়ি দেখা যাবে জনপ্রিয়তার তালিকায়। করোলা এবং দ্য প্রিমিও সম্ভবত বেশি জনপ্রিয় কারণ এটার ফাংশন বেশি এবং দামী। তাদের অনেক দামী গাড়ি আছে, যার ফাংশন একটি বড় পরিবারের জন্য অথবা দৈনিক লং ড্রাইভের জন্য -সবকিছুর একটা দাম নিধার্রিত করা আছে যা বাংলাদেশের অনেকের জন্য সাধ্যের মধ্যে।

আর যদি কেউ রানার ট্র্যাক, দ্রুত কার বা পরিবারের জন্য গাড়ি খোঁজে এমনকি বাচ্চাদের জন্য ও ব্যাগ রাখার জন্য জায়গা দরকার হয়-এমন গাড়ি টয়োটা দিতে পারবে। যে যেমনটি চাই।তারা বাংলাদেশী নাগরিকদের কম দামে ড্রাইভ করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা লাক্সারি এবং ফাংশনের জন্য বেশ কার্যকরী। টয়োটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোম্পানী, এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের উপার্জন এবং প্রয়োজন বুঝে গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে। তাদের মার্কেটে রেডিফাইনড এবং বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। তারা খুব শিগগিরই বড় ধরনের গাড়ির টাকা পরিশোধের চিন্তা থেকে মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের গাড়ির মালিক করে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। টয়োটা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সত্যিকারের জীবন পরিবর্তন করে দিচ্ছে যেন যে কেউ প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়ি ব্যবহার করতে পারে।

বাংলাদেশে টয়োটা গাড়ি ও গাড়ির প্রয়োজনীয় পার্টস বা যন্ত্রাংশ
দেশে এই গাড়িটি জনপ্রিয় হওয়ায় এই কোম্পানির গাড়ি এবং গাড়ির প্রয়োজনীয় পার্টস বা যন্ত্রাংশ সকলের কাছে জনপ্রিয়। অনেক আবার প্রতারিত হচ্ছেন। আসল টয়োটা গাড়ি বা গাড়ির প্রয়োজনীয় পার্টস ক্রয় করতে ধোকার হাত থেকে বাঁচতে পারছেন না। বিক্রেতা মেডেইন জাপান বললে তা মূলত চায়না, তাইওয়ান বা অন্য কোন দেশের তৈরি।উপরে চকচকে করলেও গাড়িটি মূলত আসল নয়। নতুন গাড়ি বা গাড়ির পাটর্স ক্রয় বিক্রয়ে তাই প্রয়োজন বিশ্বস্ত অটোমো্বাইল সেবা।আসল জাপানিজ টয়োটা গাড়ি ক্রয় করতে নানা ধরণের সুবিধা প্রদান করছে সাদিয়াটেক অটোমোবাইল লি: দেশে এবং প্রবাস থেকেও সাদিয়াটেক লিমিটেড এর অটোমোবাইল গ্রাহক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। সাদিয়াটেক দিচ্ছে আসাল টয়োটা গাড়ি ও গাড়ির প্রয়োজনীয় পার্টস বা যন্ত্রাংশ, নতুন গাড়ি ক্রয় করতে লোন সুবিধা সহ নানা বিষয়ে ফ্রি কনসালটেনসি, প্রবাসীদের জাপানিজ টয়োটাগাড়ি ক্রয়ে হোম ডেলিভারি সহ বিভিন্ন সেবা ওয়েব সাইট থেকে জাপানিজ টয়োটাগাড়ি ক্রয়ে বা গাড়ির প্রয়োজনীয় পার্টস বা যন্ত্রাংশ সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। সরাসরি সাদিয়াটেক লিমিটেড এর সাথে যোগাযোগ: জাপান অফিস: Sadiatec 〒101-0021, CHIYODA-KU, SOTOKANDA 4-5-5, AKIBA MITAKI-KAN, 5F., TOKYO JAPAN TEL: 81-3-3255-5861 FAX: 81-3-32555862 www.sadiatec.com বাংলাদেশ অফিস: সাদিয়াটেক লিমিটেড, প্লট নং-২২, চন্ডালভোগ, নিশাত নগর, তুরাগ, উত্তরা, ঢাকা-১২০৩ ফোন: 09628111999, মোবাইল:01796111999 www.bigsle.jp

পাতাটি ৯৩৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


পথ চলার বিশ্বস্ত বন্ধু টয়োটা

এইচ এম দুলাল:: পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সৃজনশীলতা এই তিনকে একবিন্দুতে মিলিত করতে পারলে যে কোনো…


শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে

এইচ এম দুলাল:: “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে বৎসরের…


জীবনের পরিবর্তনে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

এইচ এম দুলাল:: তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশকে আমারা হতাশায় ভুগতে দেখি । তারা অনেক…


মে দিবসের চেতনা ও শ্রমিকের অধিকার জাগ্রত হোক মানবতা

এইচ এম দুলাল:: উত্তর থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিম থেকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আজ প্রযুক্তির…

শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে



এইচ এম দুলাল::

“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক
এসো এসো…

যাক পুরাতন স্মৃতি
যাক ভুলে যাওয়া গীতি
যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক
যাক যাক
এসো এসো…

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা
রসের আবেশ রাশি
শুষ্ক করি দাও আসি
আনো আনো, আনো তব প্রলয়ের শাঁখ
মায়ার কুঁজঝটি জাল যাক, দূরে যাক যাক যাক
এসো এসো…”

নব আনন্দে জাগো আজি, নব রবি কিরণে, শুভ্র সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আহ্বান পূর্ণতা লাভের আরেকটি পর্যায়ে উপস্থিত। শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৪। স্বাগত জানাই দেশে ও প্রবাসের সকল বাঙ্গালী হৃদয়কে। বছরের প্রথম দিনে বৈশাখের হাওয়া মনের চিরন্তন রূপের বর্ণালী ছড়াতে আরেক দিনের প্রভাত নতুনের বাণী শুনিয়ে হৃদয়ে দোলার স্পন্দন করে তোলে। পুরাতনের সাথে নতুনের যে যোগাযোগ পহেলা বৈশাখ তারই যোগসূত্র। বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠে বছর ঘুরে এলেই উচ্চারিত হয়, আসুক বৈশাখ, নতুনের বাণী শুনিয়ে তাদের হৃদয়কেও সোচ্চার করে তুলুক। তাই বাংলার মানুষ হৃদয়ের অমৃত বাণী দিয়ে পহেলা বৈশাখকে বরণ করে সুরেলা কণ্ঠে বলে, স্বাগতম পহেলা বৈশাখ। শুধু বাংলোদেশে নয় প্রবাসে এ প্রিয় উৎসব নিয়ে পালন করা হয় নানা আয়োজন।

১৫৫৬ সালে শুরু হয়ছেলি বাংলা সনরে প্রর্বতন। মোগল সম্রাট জালালউদ্দনি মোহাম্মদ আকবররে সিংহাসনে আরোহনরে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তার রাজস্ব র্কমর্কতা আমির ফতহেউল্লাহ সিরাজী প্রথম ১৫৫৬ সালে উৎসব হিসেবে বৈশাখকে পালন করার নির্দেশ দেন। একই ধারাবাহিকতায় ১৬০৮ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীররে নির্দেশে সুবদোর ইসলাম খা চিশতি ঢাকাকে যখন রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলেন, তখন থেকেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য বাংলা বছররে পহলো বৈশাখকে উৎসবরে দিন হিসেবে পালন শুরু করনে। ঐতিহাসিক তথ্যে আছে যে, সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবদোর ইসলাম চিশতি তাঁর বাসভবনরে সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং বৈশাখ উৎসব পালন করতনে। সেখানে সরকারি সুবদোর হতে শুরু করে জমিদার, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপস্থতি থাকত।প্রজারা খাজনা নিয়ে আসত সেই উপলক্ষে সেখানে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি চলত মেলায় গান-বাজনা, গরু-মোষের লড়াই, কাবাডি খেলা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। পরবর্তীতে ঢাকা শহরে মিটর্ফোডরে নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, বুড়িগঙ্গার তীরর্বতী ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল, ফরাসগঞ্জ এর রূপলাল হাউস, পাটুয়াটুলীর জমিদার ওয়াইযের নীলকুঠির সামনে প্রতি পহলো বৈশাখে রাজ পুন্যাহ অনুষ্ঠান হতো। প্রজারা নতুন জামাকাপড় পরে জমিদারবাড়ি খাজনা দিতে আসত। জমিদাররা আংগীনায় নেমে এসে প্রজাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। সবশেষে ভোজর্পব দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হতো।

বৈশাখের সঙ্গে বাঙালি-জীবনের একটা অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নবান্নের পর মানুষ এ মাসে যেন কর্মক্লান্ত জীবনের মাঝে অনাবিল স্বস্তি ফিরে পায়। কাজের চাপ নেই। ক্ষেত-খামারে যেতে হবে না। অনেকটাই অবসর জীবন। আগে গ্রামদেশে এইদিন শেষে সন্ধ্যাবেলা গানের আসর বসত। আসরে পালাগান হত, পুঁথিপাঠ হত। এখন সেই দিন নেই বললেই চলে। “হালখাতা” এখন হয়না বললেই চলে-কিন্তু পহেলা বৈশাখ এদেশের আপামর মানুষের মনের উতসবের আমেজ আজ অম্লাণ। বছরের অন্যান্য মাসে যেন সারা দিনমান ক্ষেত্রে খামারে কাজ করতে হয়, বৈশাখে এসে জীবনের ধারা বদলে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে ওঠে উৎসবে মুখরিত। ভিন্ন আংগীকে, ভিন্ন পরিবেশে এখনও গান-বাজনায় মেতে ওঠে জীবন। এ জীবনের মাঝেই বাংলাদেশের মানুষ খুঁজে পায় এক নতুন আস্বাদ, নতুন করে জীবন চলার পথের প্রেরণা আর উদ্দীপনা। তাই বাঙালি জীবনে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেয়ে পল্লী মানুষের জীবনে এ মাসে, এ ঋতুতে নেমে আসে এক নব আনন্দধারা। এ ধারায় সিঞ্চিত হয়ে মানুষ নব উদ্দমে পরের মাসগুলোর কর্মমুখর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে-এটাই বাঙ্গালী জীবনে বৈশাখের বৈশিষ্ট। বাউল মন গেয়ে ওঠে…
“আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে
পাগলা মনে রঙ্গিন চোখে, নাগরদোলায় বছর ঘুরে
একতারাটার সুরটা বুকে, হাজার তালের বাউল সুরে
দেশটা জুড়ে খুশির ঝড়ে একটা কথাই সবার মনে
আইলো আইলো রে-
আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে

লাল পাড়ের ওই শাড়ির আচল, আলতা পায়ে খুশির নাচন
ইলশে ভাজা পান্তা খাওয়া, সব বাধার আজ খুলছে বাঁধন
পাগলা মনের খুশির ভিড়ে বৈশাখী রঙ লাগলো প্রাণে
আইলো আইলো রে-
আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে

গাছের ডালে আমের মুকুল, আকাশ মেঘে সাজলো দুপুর
হালখাতা সব হিসেব শেষে, আসলো বছর নতুন বেশে
এক বাণীতে সব বাঙ্গালি খুশির মেলায় দেশটা হাসে
আইলো আইলো রে
আইলো আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে
পাগলা মনে রঙ্গিন চোখে নাগরদোলায় বছর ঘুরে
একতারাটার সুরটা বুকে হাজার তালের বাউল সুরে
দেশটা জুড়ে খুশির ঝড়ে একটা কথাই সবার মনে
আইলো আইলো রে
আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে”

বৈশাখে উৎসবের ঢল নেমে আসে যান্ত্রীক শহুরে জীবনেও। মেলা বসে রমনা পার্ক, ধানমন্ডি লেক এমনকি সংসদ ভবন এলাকাতেও। মেলাবসে শহরে-নগরে গঞ্জে। কত না বিচিত্র হাতের তৈরি দ্রব্যসম্ভার সেসব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল দ্রব্যসামগ্রীতে বাংলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। এ সকল মেলা যেন গ্রাম-বাংলার মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খন্ড খন্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারুকাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিরমালা, মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া-বাঘ-সিংহ কত যে অদ্ভুত সব সুন্দর জিনিসের সমাবেশ ঘটে সেই মেলায়, চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন কত সমৃদ্ধশালী। মানুষ গরীব হতে পারে, দারিদ্র্য চিরসাথী হতে পারে, কিন্তু এসব জীবন জটিলতা তাদের মনকে আনন্দ খুশি থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। গানে-সঙ্গীতে তারা তাদের জীবনকে ভরিয়ে তোলে। কোকিলের কুহুতান শেষ হয়ে গেলে বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম আসে। পৌষ-মাঘের শীত আর ফাল্গুন-চৈত্রের বসন্ত যেন এক হয়ে তাদের জীবন আনন্দ হিল্লোলিত করে তোলে বৈশাখের আগমনে নতুন পথ-পরিক্রমার বার্তা বয়ে আনে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ গ্রীষ্মকাল। কিন্তু গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ তাদের জীবনকে বিচলিত করতে পারে না। তারা খুশিতে গান গায়, তারা সংগীতের আসরের আয়োজন করে। তাই বৈশাখ বাংলার মানুষের জীবনী শক্তি।
জেগেছে বাঙ্গালির ঘরে ঘরে এ কি মাতন দোলা
জেগেছে সুরেরই তালে তালে হৃদয় মাতন দোলা
বছর ঘুরে এলো আরেক প্রভাত নিয়ে
ফিরে এলো সুরের মঞ্জুরী
পলাশ শিমুল গাছে লেগেছে আগুন
এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি

মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে
বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে ললনারা হেটে যায়
ঐ বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই
মেলায় যাই রে মেলায় যাই রে

জেগেছে রমণীর খোপাতে বেলী ফুলের মালা
ভিনদেশী সুগন্ধী মেখে আজ প্রেমের কথা বলা
রমনা বটমূলে গান থেমে গেলে
প্রখর রোদে এ যেন মিছিল চলে
ঢাকার রাজপথে রঙের মেলায়
এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি…

মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে
বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে ললনারা হেটে যায়
ঐ বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই
মেলায় যাই রে মেলায় যাই রে”

জাতিগতভাবেই বাঙালি ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির দেশ। সামাজিক অনুষ্ঠানে নানা ধরনের গান পরিবেশিত হয়। এসব গানে বাংলার মানুষের প্রাণের কথা, মনের ভাষা, হৃদয়ের আবেদন আর অন্তরের আকুলতা অত্যন্ত বাস্তব হয়ে ধরা পড়ে। মাঠের গান,নদির ও মাঝির গান, লোকগান বাংলা মানুষের আপন সংস্কৃতি। এতে রয়েছে পল্লী মানুষের সহজ-সরল ভাবের প্রকাশ। এতে শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতা নেই। আছে শুধু সহজ-সরল অনুভূতি আর আবেদন। তাই লোকসংগীত বাংলার মানুষের প্রাণ। এ সঙ্গীত চিরায়ত। এতে আছে মাটির কাছাকাছি মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-আকাঙক্ষা, বিরহ-বেদনার কাহিনী এ সঙ্গীতের মূল বিষয়বস্তু। গ্রাম্য জীবন, প্রকৃতি আর পল্লী মানুষের মনের কথা- এই তিনের মিলনে নির্মিত এই গান। এই গান সৃষ্টির মূলে রয়েছে কৃষক, জেলে, মাঝির মতো গ্রাম্য মানুষের প্রাণের আর্তি আর হৃদয়ের ভাষা। এ গানে কোনো কৃত্রিমতা নেই।

মূলত পহেলা বৈশাখ ছিল গ্রাম বাংলার একটি অবিচ্ছেদ্য জীবনাচারের অংশ, এদিন পুরাতন বছরের হিসেব চুকিয়ে নতুন বছরের হিসেব খোলা হত। গত দুই দশকে এই অনুষ্ঠানে কর্পোরেট বানিজ্য এবং আমাদের যে কোন বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত আদিখ্যেতার জোয়ারে হারিয়ে গেছে গ্রাম বাংলার পহেলা বৈশাখ, জন্ম নিয়েছে নতুন এক হাইব্রিড পহেলা বৈশাখ। যেখানে হাজার টাকায় পান্তা ইলিশ খাওয়া হয়, বৈশাখী কনসার্ট আয়োজন করা হয়, বৈশাখী ডিজে পার্টি, বৈশাখী ফ্যাশন শো হয়, আরও কত কি হয় তা আমার জানা নেই।

এত কথার শেষ কথা, আপনি যে কোন উৎসব পালন করার স্বাধীনতা রাখেন যে কোনভাবে, কিন্তু সেই উৎসবকে আপনার মনের মত করে রাঙিয়ে কোন গোষ্ঠী, দল, জাতির কাছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিতে পারেন না। প্রায় হাজার বছরের পুরানো বাংলা বর্ষ এবং নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস নিশ্চয়ই কয়েকযুগ আগে কতিপয় ব্যাক্তি দ্বারা প্রচলিত রীতি দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই উন্মুক্ত তথ্যপ্রবাহের যুগে ইতিহাস আমাদের দোরগোড়ায় চলে আসবেই। তাই অধুনা প্রচলিত ‘বাংলা নববর্ষ উদযাপন’ই হাজার বছরের প্রচলিত বাংলা বর্ষবরণ সংস্কৃতি নয়। কোথায় রয়েছ কৃষিভিত্তিক বাংলার বর্ষবিদায় আর বর্ষবরণ? হালখাতা, বর্ষ শেষের ঝাড়ামোছা, গ্রাম বাংলার সেই বৈশাখী মেলা?

একেবারে শেষে শুধু একটা কথাই বলতে চাই, সব কিছুতে হাজার বছরের বাঙালীর ইতিহাস জুড়ে দিবেন না। হাজার বছর অনেক লম্বা সময় আর ইতিহাস অনেক গভীর একটি বিষয়।

পাতাটি ৯৪৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


পথ চলার বিশ্বস্ত বন্ধু টয়োটা

এইচ এম দুলাল:: পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সৃজনশীলতা এই তিনকে একবিন্দুতে মিলিত করতে পারলে যে কোনো…


শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে

এইচ এম দুলাল:: “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে বৎসরের…


জীবনের পরিবর্তনে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

এইচ এম দুলাল:: তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশকে আমারা হতাশায় ভুগতে দেখি । তারা অনেক…


মে দিবসের চেতনা ও শ্রমিকের অধিকার জাগ্রত হোক মানবতা

এইচ এম দুলাল:: উত্তর থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিম থেকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আজ প্রযুক্তির…