আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস



ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কোনো কোনো অঞ্চল বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় আরাকানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যেমন চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারকে আলোচনা করা হয় তেমনি আরাকানে ইসলামের আগমন আলোচনা করতে হলেও চট্টগ্রামের আলোচনা অপরিহার্য। মূলত: চট্টগ্রামে ইসলামের আগমন অর্থই হলো আরাকানে ইসলাম প্রচারের সূচনা। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকেই আরাকানে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগতভাবে সংঘবদ্ধ সমাজ জীবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অস্ট্রো-এশীয় এবং ভোট-চীনা গোত্রীয় মানুষই আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের খ্রিস্টপূর্ব যুগের আদিবাসী বলে অনুমান করা হয়। মারু বংশীয় রাজারা বংশ পরম্পরায় তখন আরাকান শাসন করতেন। অযোধ্যা ও বিহার অঞ্চলের জৈন এবং পরবর্তীতে জড়বাদী হিন্দু ধর্মদর্শন কর্তৃক প্রভাবিত ছিল তৎকালীন আরাকানের সমাজ ব্যবস্থা। ক্রমশ এতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, এমনকি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের লোকেরা আরাকানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মগধ থেকে আগত চন্দ্র-সূর্য বংশের রাজাদের প্রভাবে আরাকানে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বিস্তার ঘটে। এভাবে পুরোপুরিভাবে ভারতীয়কৃত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আরাকানের বিভিন্ন স্থানের নাম ভারতীয় অনুকরণে আমরাপুর, রামাবতী, ধন্যাবতী, বৈশালী, হংসবতী প্রভৃতি নাম করণ হয়। রাজবংশের নামও ছিল ভারতীয় অনুকরণে মারু, কানরাজগজি, চন্দ্র-সূর্যবংশ, পিনসা প্রভৃতি এবং আরাকানে রাজাদের নামও রাখা হতো ভারতীয় প্রথা অনুসারে। সেখানে ভারতীয় বর্ণমালা ব্রাহ্মীলিপিতে সংস্কৃত ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি ও শিবাদি দেবতার প্রতিষ্ঠা ছিল এবং মুদ্রায় বৃষমূর্তি, ধ্বজ প্রভৃতি অংকিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান একটি অখন্ড রাজ্য হিসেবে চন্দ্রসূর্য রাজাদের হাতে শাসিত হলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের সমাজ গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে এবং আরাকানী সমাজ গড়ে ওঠে বৌদ্ধ ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে।
প্রাচীন চট্টগ্রাম ও আরাকানের হিন্দু সম্প্রদায় মূলত ভারতবর্ষের হিন্দু জাতির অংশ। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, শুদ্র এই চার প্রধান বর্ণ ও ছত্রিশ জাত নিয়ে এখানকার হিন্দু সম্প্রদায় গঠিত হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত অর্থে ৪১টি উপবর্ণের সমন্বয়ে তা গঠিত ছিল। প্রাচীনকালে গোত্রগত পেশার ভিত্তিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছিল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে আর্যবংশীয় হিন্দুদের সাথে স্থানীয় আদিম জনগোষ্ঠীর বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। তৎকালীন সময়ে আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের হিন্দু সমাজে কৌলিন্য প্রথা প্রবল ছিল। বিয়ে-শাদী-নৃত্য নিমন্ত্রণে সামাজিক সিঁড়ি প্রথা প্রচলিত ছিল এবং তা কড়াকড়িভাবে পালন করা হতো। সামাজিক বৈঠকে কৌলিন্যের মান অনুসারে বংশের প্রধান ব্যক্তিরা সিঁড়ি বা লাইনের প্রথম স্থানে বসত। এরপর কৌলিন্যের মান অনুসারে সবাই পরপর লাইনে বসত। তাদের মধ্যে ছুৎবাই ছিল খুব বেশি। কুলীনরা অকুলীন বাড়িতে সচরাচর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতো না; বিশেষ কারণে বিশেষ কোনো বাড়িতে নিমন্ত্রণে গেলেও সেখানে যাওয়ার সময় পারিবারিক গোলাম বা দাস দ্বারা নিজেদের থালাবাটি সঙ্গে নিয়ে যেত। আরাকানের শাসকগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও সাধারণ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। বিশেষত হিন্দুদের বর্ণ প্রথার কারণে ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ত্রিপুরা হয়ে আরাকানে এসে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়ে যেত। ক্রমশ আরাকানের শাসকরারও সামাজিক পরিবেশের আলোকে নিজেদেরকে বৌদ্ধ মতাবলম্বী হিসেবে প্রকাশ করতে থাকে। বিশেষ করে আরাকান রাজা ছান্দা থুরিয়া (১৪৬-১৯৮) আরাকানের সমাজে বৌদ্ধ ধর্মমতের বিস্তার ঘটান। এভাবে ইসলাম আগমণের পূর্ব পর্যন্ত আরাকানী সমাজে বৌদ্ধ ধর্মের প্রায় একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আরাকানে ইসলামের আগমন
পঞ্চম শতাব্দীর শেষ থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের হাতে নিম্নবর্ণের হিন্দু-বৌদ্ধরা ব্যাপকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। আরাকানের শাসকরা হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী হলেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগী হওয়ার কারণে আরাকান অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের দ্রুত প্রসার ঘটে। হিজরি প্রথম শতকের শেষ দিকে (৯৬ হিজরী) ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্যদিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিকভাবে ইসলামের প্রতিষ্ঠা শুরুহলেও মূলত পবিত্র মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রায় সমসাময়িক কালে মহানবী (স.) এর জীবদ্দশাতেই ভারতীয় উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষত আরাকান অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায়। কেননা খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ব থেকে আরব বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পথে ভারত, বার্মা ও চীনের ক্যান্টন বন্দরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। সে সূত্রেই আরবের কুরাইশরাও ইসলাম পূর্ব যুগেই এ বাণিজ্যপথে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। বিশেষত পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্য (ইরান) ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে আরবদের স্থল বাণিজ্যপথ মারাত্মকভাবে বিপদ সংকুল হয়ে পড়েছিল। ইয়েমেন ও হাজরা মাউতের আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যের পূর্ব অভিজ্ঞতার সুবাদে আরবের কুরাইশরাও নৌবাণিজ্যে আগ্রহী হয়ে পড়ে। সে সূত্রেই মহানবী (স.) এর আগমনের আগেই তারা ভারতীয় উপমহাদেশ, বার্মা, কম্বোডিয়া ও চীনের ক্যান্টন পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর সূচনা লগ্নেই তারা দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেররবন্দর, তৎকালীন আরাকানের চট্টগ্রাম ও আকিয়াবের সমুদ্রোপকূলে স্থায়ী বাণিজ্যিক উপনিবেশও গড়ে তোলে। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক কালের মুসলমানরাও বাণিজ্যিক কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে আসে এবং সপ্তম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চীনা বাণিজ্যে মুসলিম প্রভাব অব্যাহত রাখে। তৎকালীন দক্ষিণ চীনের ক্যান্টন বন্দর ‘খানফু’ নামে পরিচিত ছিল। মুসলিম বণিকরা এ সময় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত মালাবার এবং চট্টগ্রাম থেকে কাঠ, মসলা, সুগন্ধী দ্রব্য ও ঔষধি গাছ-গাছড়া সংগ্রহ করতেন। বাণিজ্যিক কারণে মুসলমানরা এ সব অঞ্চল সফর করলেও মূলত ইসলাম প্রচার তাদের মুখ্য বিষয় ছিল।

চীনের কোয়াংটা শহরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন কাদেসিয়া যুদ্ধের বিজয়ী সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিতা আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াইব। এরই অদূরে তাঁর মাজার এখনো বিদ্যমান। আবু ওয়াক্কাস (রা.) মহানবী (সা.) এর নবুয়তের সপ্তম বছরে হযরত কায়স ইবনে হুযায়ফা (রা.) হযরত ওরওয়াহ ইবনে আছাছা (রা.) এবং হযরত আবু কায়স ইবনে হারেছ (রা.) কে সঙ্গে নিয়ে একখানা সমুদ্র জাহাজে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তারা উক্ত জাহাজে প্রথমত ভারতের মালাবারে এসে উপস্থিত হন এবং সেখানকার রাজা চেরুমল পেরুমলসহ বহুসংখ্যক লোককে ইসলামে দীক্ষিত করে চট্টগ্রামে এসে যাত্রা বিরতি করেন। অতঃপর তিনি ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে চীনের ক্যান্টন বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হন। আবু ওয়াক্কাস (রা.)এর দলটি ৬১৭ খ্রিস্টাব্দে রওয়ানা দিয়ে প্রায় নয় বছর পর চীনে পৌঁছায়। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, এ নয় বছর তারা পথিমধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যয় করেছেন। কারণ চীনে আগমনের জন্য আরবদেশ থেকে রওনা করলে বাতাসের গতিবেগের কারণে বিভিন্ন স্থানে নোঙ্গর করতে হতো। বিশেষত বণিকেরা এক্ষেত্রে মালাবার, চেরর, চট্টগ্রাম, আকিয়াব, চীনের ক্যান্টন প্রভৃতি স্থানে জাহাজ নোঙ্গর করত। অতএব, অনুমান করা যায় যে, তিনি মালাবারের পর চট্টগ্রাম ও আকিয়াবেও জাহাজ নোঙ্গর করে ইসলাম প্রচারের কাজ করেছেন এবং সে সূত্রেই হিন্দের (বৃহত্তর ভারতের কোন অঞ্চলের) জনৈক রাজা কর্তৃক মহানবী (সা.) এর কাছে তোহফা পাঠানোর উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিন্দের জনৈক শাসক মহানবী (সা.) এর কাছে এক পোটলা হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে আদাও ছিল। মহানবী (সা.) সাহাবিদেরকে তার (আদার) এক টুকরা করে খেতে দিয়েছিলেন এবং (রাবি বলেন) আমাকেও এক টুকরা খেতে দেয়া হয়েছিল। হিন্দের কোন শাসক মহানবী (সা.) এর কাছে হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে, রুহমী রাজ্যের শাসকরা বহুকাল আগে থেকেই পারস্যের শাসকদের কাছে মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা পাঠাতো। সম্ভবত এ রুহমী রাজাদেরই কোনো রাজা মহানবী (সা.) এর কাছে হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, রুহমী রাজ্য সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকলেও বেশিরভাগ ঐতিহাসিক রুহমী বলতে আরাকান রাজ্যকে বুঝিয়েছেন। কেননা, আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোখাম’। এটি আরবি শব্দ; যার অর্থ শ্বেতপাথর এবং আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ম্রোহংয়ের পূর্বনাম কায়কপ্রু। এটি বার্মিজ শব্দ; যার অর্থও শ্বেত পাথর। এদিক থেকে কায়াকপ্রু অঞ্চল ও রোখাম একই অঞ্চল। সে কারণে রুহমী বলতে রোখাম বা আরাকানকেই বুঝানো যায়। মনে করা হয় যে, রোখাম শব্দটির বিকৃতরূপই রুহমী। তবে কেউ কেউ রুহমী বলতে রামুকে বুঝিয়েছেন। যদি এটা ধরে নেয়া হয় তবুও আরাকানই হয়। কেননা তখন রামু আরাকানেরই অংশ ছিল। তাছাড়া হাজার বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরাকানের ঐতিহ্যও অস্বীকার করা যায় না।

সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরব মুসলিম বণিকরা চট্টগ্রাম-আরাকান অঞ্চলে বাণিজ্য মিশন নিয়ে যাতায়াত শুরু করলেও অষ্টম শতাব্দীতে তাদের আগমন আরো বেড়ে যায়। এ সময় চট্টগ্রাম ও আরাকানে আগত আরব বণিকদের সংস্পর্শে এ এলাকার মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। বণিকরা কেউ সপরিবারে আসেননি। অন্যদিকে মৌসুমী বায়ুর জন্য তাদেরকে প্রায় ৫/৬ মাস অপেক্ষা করতে হতো। এ সময় তারা স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মহিলাদের বিয়ে করতেন। বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ মহিলারা যেমন ইসলাম গ্রহণ করতেন তেমনি তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানরাও ইসলামের সুমহান আদর্শকে গ্রহণ করেই বেড়ে ওঠেন। এভাবে ক্রমশ আরব বণিক, বহিরাগত মুসলিম দরবেশ, সুফি, উলামা ও ইসলাম প্রচারকদের উৎসাহ উদ্দীপনায় চট্টগ্রাম ও আরাকানে বসবাসরত নির্যাতিত হিন্দু ও বৌদ্ধরা ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে চট্টগ্রামসহ মুসলিম পরিবারের সমন্বয়ে একটি মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। দশম শতাব্দীতে সেখানে মুসলিম সমাজের প্রভাব এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, কোনো কোনো গবেষক একে ছোটখাট মুসলিম রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করে এর আমীরকে ‘সুলতান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ সুলতানের অধীনস্ত এলাকা ছিল মেঘনা নদীর পূর্বতীর থেকে নাফ নদীর উত্তর তীরবর্তী সমুদ্রোপকুলবর্তী ভূ-ভাগ পর্যন্ত।

আরাকানের জাতীয় ইতিহাস রাজোয়াংয়ের সূত্রে তারা উল্লেখ করেন যে, আরাকানরাজ সুলতইঙ্গ-ৎ-চন্দ্র (৯৫১-৯৫৭) ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ্য জয়ে বের হন। তিনি নিজ রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে ‘থুরতন’কে পরাজিত করে চেত্তাগৌং – এ একটি পাথর নির্মিত বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করে পাত্র মিত্রের অনুরোধে তিনি স্বরাজ্যে ফিরে যান। এ ‘চেত্তাগৌং’ অর্থ যুদ্ধ করা অনুচিত। এ শব্দ থেকেই চট্টগ্রাম নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। উল্লেখ্য যে, এখানে ‘থুরতন’কে পরাজিত করা বলতে অর্থাত সেই মেঘনা অববাহিকায় প্রতিষ্ঠিত নব ইসলামী রাজ্যের সুলতানকে বুঝানো হয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন। কিন্তু এ বিষয়টি বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। তবে বাংলায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগেই যে চট্টগ্রাম আরাকানে ইসলামী পরিবেশ সম্বলিত সামাজিক অবকাঠামো নির্মিত হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায় এবং বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর তা যে আরো সুদৃঢ়রূপ লাভ করেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

নাইম বিন হাম্মাদ এর উদ্ধৃতিতে রুহমী রাজা কর্তৃক খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজকে (৭১৭-৭২০ খ্রি.) চিঠি পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। সে চিঠিতে বলা হয়েছে-“রুহমী শাহেন শাহের পক্ষ থেকে যিনি হাজার বাদশাহর অধঃস্তন পুরুষ, যার স্ত্রীও হাজার বাদশাহের অধঃস্তন কন্যা এবং যার হাতিশালায় সহস্ত্র হাতি ও যার রাজ্যে দু’টি নহর রয়েছে সেগুলোতে উদ উৎপন্ন হয়। এছাড়া কর্পুর, করমচা, বাদাম গাছও রয়েছে এবং যার প্রতিপত্তি ১২ শত মাইল দূর থেকেও পাওয়া যায়। এর পক্ষ থেকে আরবের বাদশাহ যিনি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করেন না তার প্রতি। অতপর: আমি আপনার নিকট কিছু হাদিয়া পাঠাচ্ছি। বস্তুত এটি হাদিয়া নয় বরং কৃতজ্ঞতা। আমি আশা করি আপনি আমার কাছে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠাবেন যিনি ইসলাম বুঝাবেন ও শুনাবেন।

আরাকানের চন্দ্র-সূর্য বংশের প্রথম রাজা মহৎ ইঙ্গ চন্দ্র (৭৮৮-৮১০ খ্রি.)৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বৈশালীতে রাজধানী স্থাপন করে শাসনকাজ পরিচালনা শুরুকরেন। তার উদারনীতির কারণে মুসলমানরা ইসলাম প্রচারের ব্যাপক সুযোগ পায় এবং সে সূত্রেই আরব মুসলিম বণিকরা রাহাম্বী বন্দরসহ আরাকানের নৌবন্দরগুলোতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ও ইসলাম প্রচার মিশন পরিচালনা করতে থাকে। এ রাজার শাসনামলেই কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্যবহর রামব্রী দ্বীপের পাশে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম বলে চিৎকারের মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করতে থাকে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে রাজার কাছে নিয়ে যায়। রাজা তাদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরাকানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেন। এভাবে অষ্টম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চল হতে শুরু করে মেঘনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী বিস্তীর্ণ বন্দরগুলো আরব বণিকদের কর্মততপরতায় মুখরিত হয়ে ওঠে। এমনকি মুসলমানদের সুমহান আদর্শেরপ্রতিও শাসকরা মনস্তাত্বিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ার নিদর্শন পাওয়া যায়। কেননা খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ (৭১৭-৭২০ খ্রি.) এবং আব্বাসীয় খলিফা মামুনকে (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) রুহমীর রাজা চিঠি লিখেছিল। রুহমী বলতে আরাকান বুঝানো হলে আরাকানের শাসক যথাক্রমে রাজা সূর্যক্ষিতি (৭১৪-৭২৩ খ্রি.) এবং সূর্য ইঙ্গ চন্দ্র (৮১০-৮৩০ খ্রি.) এ চিঠিগুলো লিখেছিলেন।

দশম ও একাদশ শতাব্দীতে আরব বণিক ও সুফি দরবেশদের মধ্যে বদরুদ্দিন (বদর শাহ) নামে একজন ইসলাম প্রচারক এ অঞ্চলে আসেন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার নামানুসারে অসমের সীমা থেকে শুরু করে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ‘বদর মোকাম’ নামে মসজিদও নির্মিত হয়েছে। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ও আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বলেন, খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে আরাকানে ইসলাম বিস্তৃতি ও মুসলমানদের প্রভাব অন্যান্য ঐতিহাসিকও স্বীকার করেছেন। এই সময় হইতেই অসমের সীমা হতে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত সমদ্র তীরবর্তী ভূ-ভাগের নানা স্থানে ‘বুদ্ধের মোকাম’ নামক এক প্রকার অদ্ভূত মসজিদ গড়ে উঠতে থাকে; এই মসজিদগুলোকে বৌদ্ধ, চীনা ও মুসলমান জাতি সমভাবে সম্মান করে থাকে।

উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে বদর মোকাম মসজিদটি নবম অথবা দশম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হলেও আরাকানী লেখক ডা. মুহাম্মদ ইউনুস একে ৭ম শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত বলে দাবি করেছেন। এমনকি ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিমের বইতেও বদর মোকামের ছবি দিয়ে এটাকে সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগে রচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, বিভিন্ন বর্ণনায় চতুর্দশ, অষ্টাদশ প্রভৃতি শতাব্দীতে নির্মিত বলে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু দশম ও একাদশ শতাব্দী থেকেই বদর উদ্দীন, বদরশাহ প্রভৃতি নামে পির বদরের সন্ধান পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে ‘বদর মোকাম’কে দশম শতাব্দীর মনে করা যেতে পারে।

আকিয়াবে অবস্থিত বদর মোকামে দু’টি দালান আছে। একটি টিলার উপরে। এটির উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দু’দিকে দু’টি দরজা আছে। সেখানে একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদটি চার কোণা মিনার ও গম্বুজ বিশিষ্ট। পশ্চিমের দেয়ালে বদর মোকামের মূল পরিচালকের নিযুক্তিপত্র ফারসি ভাষায় লেখা হয়েছে। এ মসজিদটি বৌদ্ধ প্যাগোডা ও ভারতীয় মসজিদের মিশ্র নির্মাণ শৈলীতে নির্মিত। উল্লেখিত বদর মোকাম মসজিদের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে একটি পাথর রয়েছে যেখানে পির বদরের পায়ের পাতার চিহ্ন ও হাটুর দাগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অনুমান করা হয় যে, হযরত বদর উদ্দীন (রহ.) অনবরত ইবাদত ও সাধনা করার ফলে উক্ত পাথরে তাঁর পায়ের হাঁটুর দাগ বসে গেছে। আরাকানী জনগণসহ সমুদ্রপথে চলাচলকারী বণিক ও নাবিকরা তাঁকে ব্যাপকভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করে থাকে। পির বদর সমুদ্র পথে যাতায়াত করতেন বলে নাবিকরা তাকে ‘দরিয়া পির’ বলে বিশেষভাবে স্মরণ করে; এমনকি তাঁর আস্তানা, চিল্লাখানা বা দরগাহও সমুদ্রের উপকূলে। তাই তিনি হয়তো আরব দেশ থেকেই এসে থাকবেন। যদি তাই হয়ে থাকে তবে সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগে যেসব বণিক ও নাবিক ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন তাদের মধ্যে কেউ ‘বদর’ নামে ছিলেন না তা কি করে বলা যাবে? হয়তো তখন থেকে আকিয়াবে মসজিদ স্থাপিত হলেও ত্রয়োদশ কিংবা চতুর্দশ শতাব্দীতে বদর উদ্দীন নামক কোনো অলী এসে সে মসজিদে নতুনভাবে আবাদ করেন এবং ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে সওদাগর ভ্রাতৃদ্বয় ওই মসজিদ আবার সংস্কার করেন। মসজিদের ভেতরে রক্ষিত পা ও হাঁটু চিহ্নিত পাথরটি পির বদরের জীবদ্দশাতেই ‘বদর মোকামে’র অস্তিত্ত্ব বজায় থাকার প্রমাণ বহন করে।

এভাবে চট্টগ্রাম এবং আরাকানে আগত ও বসতি স্থাপনকারী আরব বণিক সম্প্রদায়, নাবিক, সুফি, দরবেশ শ্রেণী এবং ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও মোগলদের শাসনামলে বাংলা থেকে আগত মুসলমানদের সঙ্গে এ অঞ্চলের (চট্টগ্রাম-আরাকান) নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংমিশ্রণ ঘটে এবং তারা ব্যাপকহারে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল বাংলা, আরাকান, ত্রিপুরা ও বার্মার লক্ষ্যস্থল এবং আরাকান রাজ্যের অধীনে চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন শাসিত হওয়ার ফলে চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, নবদীক্ষিত মুসলমান, বহিরাগত ইসলাম প্রচারক-বণিক, সুফি-দরবেশ, উলামা সম্প্রদায় অবাধে আরাকানে ইসলাম প্রচারের জন্য যাতায়াত করতেন। ফলে, চট্টগ্রামের মতো আরাকানেও একটি ইসলামী পরিবেশ সম্বলিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। পর্দা প্রথা, খাদ্যাভ্যাস, রান্না পদ্ধতি, এমনকি মানবীয় আচরণেও ইসলামের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। পরবর্তীতে বরেণ্য পির-দরবেশদের মধ্যে চকপিউ এর মুন্সী আবদুন নবী, আকিয়াবের শাহ মোনায়েম (বাবাজি), হায়দার আলী শাহ (কাহারুশাহ), নূরুল্লাহ শাহ (কৈলা শাহ) এবং আজল উদ্দীন শাহের (আজলা শাহ) নাম উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দীন বদরে আলম যাহিদী নামক একজন অলী তিন/চারশ’ অনুগামী ইসলাম প্রচারক নিয়ে ভারতের মিরাঠাবাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। তিনি ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে বিহারে চলে যান এবং ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তারা নানারূপ বিকৃত বৌদ্ধ-হিন্দুয়ানী আচরণ ও প্রথা রহিত করে মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সত্যিকারের ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তোলার জন্য আমরণ চেষ্টা করেছেন। এভাবে আরাকানের সামাজিক অবকাঠামোগত ভিত্তিতে ইসলামের সম্পৃক্ততা দ্রুত বেড়ে যায়।

বাংলার সুলতান জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহের (১৪১৫-১৬; ১৪১৮-৩৩ খ্রি.) সহায়তার সুবাদে নরমিখলা কর্তৃক আরাকান পুনরুদ্ধারের মধ্যদিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে সেখানকার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটলেও একাদশ শতাব্দীতেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মুসলমানদের ততপরতা পরিলক্ষিত হয়। আরাকানের পিনসা বা চাম্পাওয়াত বংশের শেষ রাজা পোন্যাক এর রাজত্বকালে ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দে পগাঁ রাজা আনওয়ারাথা আরাকান জয় করে পঁগা রাজ্যের সীমাকে বৃদ্ধি করেন এবং কৌলিন্য অর্জন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য আরাকানের বৈশালী রাজকন্যা পঞ্চকল্যানীকে বিয়ে করেন। অতঃপর তিনি ১০৫৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম ও পাট্টিকারা (বর্তমান বাংলদেশের বৃহত্তর কুমিল্লা) জয় করে ততকালীন বাংলার সীমান্ত পর্যন্ত রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান।

উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে বার্মার একক কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সে সময় থেটন, পেগু, পঁগা, আভা, প্রোম, প্রভৃতি পাঁচটি রাজ্যের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে আনওয়ারাথা কর্তৃক ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত পঁগা রাজ্য মাত্র পনের বছরের মধ্যে বিশাল শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এর আগে বার্মা, আরাকান ও বাংলায় মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতবাদ প্রচলিত ছিল। কিন্তু আনওয়ারাথা’র শাসনামলে আরাকান, চট্টগ্রাম ও পাট্টিকারা অঞ্চলে হীনযান বা থেরবাদ বৌদ্ধমত প্রচারিত হয়। রাজা আনওয়ারাথাই উদার ধর্মীয়নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমান বণিক, নাবিক, ধর্ম প্রচারকদের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন এবং রাজ্যের সৈন্য বিভাগসহ তাঁর নিজের দেহরক্ষী বাহিনীতেও মুসলমানদের নিয়োগ দেন। শুধু তাই নয়, তার সন্তানের গৃহশিক্ষক হিসেবে জনৈক মুসলিম ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে প্রথমবারের মতো মুসলমানদের কর্মতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়।

আনওয়ারাথা’র মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সাউলু ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর শৈশবকালের মুসলিম গৃহ শিক্ষকের পুত্র, দুধভাই ও বাল্যবন্ধু আবদুর রহমান খানকে (বর্মী ভাষায় ইয়ামানকান) বন্ধুত্বপ্রীতির নিদর্শন স্বরূপ উস্ সা নগরীর (বর্তমান পেগু) শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু, পরবর্তীতে দু’বন্ধুর মাঝে ভুল বুঝাবুঝির কারণে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে সউলুর বিরুদ্ধে আবদুর রহমান বিজয়ী হলেও সউলুর অন্য ভাই কানজিত্থা’র ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হন। এভাবেই আবদুর রহমান খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বার্মা তথা আরাকান অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মুসলিম প্রভাবের সূচনালগ্নেই সূর্য অস্তমিত হয়। ফলে, আরাকান তথা বার্মার প্রশাসনে মুসলিম প্রভাব শুরুতেই সমাপ্তি ঘটে।

আরাকানের মুসলিম প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-আরাকানে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে থাকে এবং চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার ক্রমশ অধঃপতিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে, ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও গৌড় থেকে আগত মুসলমানদের সংস্পর্শে আরাকানী সমাজে ইসলামের প্রভাব বিস্তৃত হয় এবং গৌড়ের মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রাম-আরাকানের অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ স্থাপিত হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালে যখন চট্টগ্রাম-আরাকান সফর করেন। তখন তিনি সেখানে অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার দেখেছিলেন। মূলত পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে আরাকানি সমাজে ইসলামের যে প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে তার প্রধান বিষয় হচ্ছে পর্দা প্রথা। ততকালীন আরাকানি সমাজে মুসলমান নারীদের পর্দা পালনের প্রভাবে আরাকানের অমুসলিম নারীদের মাঝেও এর বিস্তার ঘটে। এ সূত্রেই আরাকানি মুসলমানদের বিস্তৃতি। এছাড়া প্রাচীনকালে আরব মুসলমান বণিকরা নৌ-বিদ্যায় দক্ষ ছিলেন। তাদের সংস্পর্শে এসে চট্টগ্রাম-আরাকানের মুসলমানরাও নৌ-বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম-আরাকানের বিভিন্ন শহরের নানা স্থানের আরবি নাম, খেলাধুলা, রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারে আরবীয় প্রভাব রয়েছে। এমনকি কথা বার্তায় আরবী ভাষার অনুকরণে ‘লা’ (না বোধক শব্দ বাক্যের সূচনালগ্নে ‘আঁই ন যাইয়ুম’) ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে আরব প্রভাবের ফল- এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
সহকারী অধ্যাপক,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…

যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য



মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি বা পারা সম্ভব কিনা তা জানা নেই। তবে তা বলতে না পারলেও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম থেকে চতুর্থ সহ¯্রাব্দের মাঝে কোন এক সময় বইয়ের যাত্রা শুরু হয়। তার চেয়েও খাঁটি কথা মানুষ যখন থেকে মুখের ভাষাকে বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছে তখন থেকে বইয়ের যাত্রা শুরু। এক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠতে পারে বইতো কতগুলো নির্দিষ্ট বর্ণমালায় সজ্জিত রূপ, যা অলঙ্কারপূর্ণ ও নান্দনিকতার বিকাশের ফল। তাই বলে প্রতীকের প্রকাশকে কি বই বলা যাবে বা আদৌ যৌক্তিক হবে? জবাবে বলতে হবে, এর চেয়ে নিগূঢ় বাস্তবতা আর নেই। কারণ বর্তমান সময়ের দৃষ্টিনান্দিক ও শৃঙ্খলিত বর্ণমালা নানা প্রয়োজন ও দাবীর প্রেক্ষাপটেই বিবর্তিত হয়ে আজকে এই রূপ ধারণ করেছে।

মানুষ শুরুতে কিসের উপর লেখা শুরু করেছে তা নিয়েও বিতর্ক আছে, যা থেকে যাবে; কারণ এর নির্দিষ্ট ইতিহাস উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং সম্ভব হবেও না। তবে থাকলেও সবার একথা মেনে নেয়া ভাল প্রতীকগুলো কাঠে, পাথরে বা নরম কাদা মাটিতে, গাছের বাকলে ও পাতায় লিপিবদ্ধ করেছিল। এদের মধ্যে কাঠে লেখার প্রবণতা ছিল বেশি কেননা কাঠে লেখার উপায় ছিল কিছুটা সহজ ও স্থায়ী। এছাড়া নানা বিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে এটা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে প্রতীকের পর মানুষ নানা চিত্রায়নের মাধ্যমে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করত, যা ধীরে ধীরে বর্ণ তৈরী করে এবং সেগুলিকে আধুনিক রূপ দিয়ে আজকের এই নান্দনিককতা আমাদের কাছে এসেছে।

আরো মজার বিষয় হলো বর্তমান সময়ে বিভিন্ন জায়গায় আমরা যে চিকা মারা দেখি তা সত্যিকার অর্থে লিখন পদ্ধতিগুলোর প্রাচীনতম উপায়গুলোর একটি। যেমন খ্রস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে অসুর রাজাদের প্রচীনতম সংগ্রহশালা রাখা আবিষ্কৃত লাইব্রেরীগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। এই সংগ্রহশালা থেকে জানা যায় মানুষ সে সময়ে ভিজা কাদায় ছাপ দেয়ার জন্য ক্যালমাস নামক একধরনের ত্রিভুজ ব্যবহার করত। এধরণের বাইশহাজার নিদর্শন সেখানে আরো উজ্জ্বল প্রতীক হিসাবে এই আদি সত্য সবাইকে বলে যাচ্ছে।

তবে পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে বর্ণমালার বিকাশই কেবল বইয়ের আধুনিক রূপ দিতে হয়নি, বর্ণমালার পাশাপাশি সেগুলিকে লিপিবদ্ধ করার স্থানগুলোকেও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। তবে কাগজ আবিষ্কারের প্রাচীন স্থান চীন হলেও খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে মিশরে প্যাপিরাস তৈরী করে রাজতন্ত্রের সকল নথিপত্র লিপিবদ্ধ করা হতো। তাই কাঠ, পাতা বা পাথর ছেড়ে প্যাপিরাসে লিখন পদ্ধতিই হচ্ছে লিখন পদ্ধতির আধুনিকতম রূপ।

বিভিন্ন দেশে সভ্যতার বিকাশের অন্যতম কারণ হচ্ছে কাগজ আবিষ্কারের মাধ্যমে বই বানানো বা লিখন। এক সময়ের বর্বর বা জলদস্যু আমেরিকায় ‘আমাতে’ নামের যে কাগজ তৈরী করত তাতে বিভিন্ন বই লিখতে সে দেশীয় পন্ডিতেরা। আর এভাবেই সেখানে মায়া সভ্যতার গোড়া পত্তন ঘটে। এই বই লিখন যাত্রার মধ্য দিয়েই আমেরিকার সভ্যতার যাত্র শুরু হয়। কিন্তু এতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্পেনিশরা। স্পেনিশরা আমেরিকা দখল করে অখ্রিস্টিয় বই বলে অধিকাংশ বই ধ্বংস করে। তবে যে ক’টি বই বেঁচে ছিল তা পৃথিবীর সভ্যতার বিকাশের ধারা ও বিবর্তনকে মনে করিয়ে দেয় সবাইকে।

দীর্ঘকাল টিকে থাকা প্যাপিরাস কাগজ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে পার্চমেন্ট নামক কাগজ গরু, ভেড়া বা গাধার চামড়া থেকে তৈরী হতো বলে স্থায়ীত্ব বেশি ছিল। তাই পারগ্যামন রাজা দ্বিতীয় এউমেনেস পার্চমেন্ট কাগজে বই লেখার প্রচলন চালু করেন। ফলে প্যাপিরাসে বই লেখার প্রচলন বন্ধ হয়ে যায়।

গ্রিক সভ্যতার কথা সবার জানা আছে। গ্রিক সভ্যতার জয়জয়কার সবার মুখে মুখে। তাই অনেক সভ্যতার অবদান ঢাকা পড়ে গেছে এই গ্রিক সভ্যতার অতিরিক্ত বর্ণনায়। আবার অনেক পৌরনিক কাহিনী আমাদের হৃদয়ে স্থায়ীত্ব লাভ করে নিয়েছে সত্য হিসাবে। যেমন, টলেমি সোটার লাইব্রেরী গড়েছিলেন খিস্ট্রপূর্ব বহুপূর্বে। যেখানে বই বা ভলিউম ছিল ৫০০৯০০। কিন্তু খিস্ট্রপূর্ব ৪৭ সালে তা ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যদিকে প্যারাগ্যামন লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল খিস্ট্রপূর্ব বহুপূর্বেই। যেখানে বই ছিল ২০০০০০। কিন্তু ৬৪২ সালের দিকে আরব বিজয়ে এই লাইব্রেরী ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যায় বলে পশ্চিমারা দাবী করেছেন এবং আমরা তা বিশ্বাস করেছি। মজার বিষয় হচ্ছে এর পক্ষে কোন যুক্তি কেন নেই? কোন প্রমাণ নেই? সভ্যতার বিকাশমানতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য এরকম পৌরণিক ও আজগুবি কাহিনী তৈরীর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন আমরা অন্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে আত্মতুষ্টি লাভ করি?

এদেশের বহুপূর্বেই হাতের লেখা বইয়ের প্রচলন ছিল। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘চর্যাপদ’। কিন্তু সেগুলোকে রাজনৈতিক ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য পুঁথি হিসাবে আখ্যাদিয়ে প্রাচীন বইয়ের মর্যাদা দিতে আমাদের অনীহা বেশ জোরালো। তাছাড়া বাংলা ভাষায় বইয়ের আদি ও ইতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাহবুব রশিদ বলেন, “ভূর্জপত্র থেকে শুরু করে তালপাতা, এমনকি তুলট কাগজ দিয়ে পুঁথি ভুতোর সাথে ভাতের মাড় আঠার লেই মিশিয়ে তৈরী করা হতো কালি, আঁকা হতো রঙ্গীন ছবি।” কী দূর্ভাগ্য এ জাতির! তালপাতায় লেখা হতো বলে এই লেখাগুলি বইয়ের মর্যাদা পায়নি। কিন্তু গ্রিক বা জার্মানিরা যা দিয়েই লিখতো তাকে সম্মান করার প্রবণতা দেখে জাতির মাথা উঁচু করে থাকতে পারে না।

তবে মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কার হবার পরও দীর্ঘ সময় লেগেছে বাংলাভাষায় প্রথম মুদ্রিত বই ছাপতে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্মচারী বাংলা ভাষাবিদ নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ ব্রিটিশ কর্মচারীদের বাংলাভাষা শিখানোর জন্য যে ব্যাকরণ বই প্রকাশ করেন তাই তাই প্রথম মুদ্রিত বাংলা বই। এভাবেই আমরা ধীরে ধীরে বই পেয়েছি। সবার আগে নিজের ইতিহাস জেনে নিজের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে এবং নিজের অজানাকে জেনে অন্যদের ঐতিহ্যকেও শ্রদ্ধা করতে হবে । তবে নিজের অংহকারে বস্তু হিসাবে অন্যদের ঐতিহ্যকে চর্চা না করাই বুদ্ধিমানে কাজ।

লেখক: মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
প্রভাষক, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
ও সেক্রেটারি, চারুতা ফাউন্ডেশন
jashimnub@yahoo.com


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…

মসনবীর কবি রুমী



মসনবীর কবি রুমী

রাজু রফিক

সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায় জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তাইতো পার্থিব জীবনের শত কোলাহলের মাঝেও মানুষের মন জীবনের স্বাদ পেতে বড্ড বেশী তৃষ্ণার্ত। আর সে তৃষ্ণা নিবারনের জন্য যাদের ধ্যান ও জ্ঞান, চিন্তা ও চেতনা নিরন্তর, সেই কবি-সাহিত্যিকদের অবদান যুগে যুগে দেশে দেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং সম্মানিত। বিশ্ব সাহিত্যে ঠিক তেমনি উজ্জ্বেল নক্ষত্র এক আলোকিত নাম হচ্ছে ইরানের মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি। ফরাসী সাহিত্যের এ বিষ্ময়কর প্রতিভা গোটা বিশ্বে এক মহান আধ্যাত্যিক কবি হিসেবে সুপরিচিত। রুমীর আসল নাম ছিল জালাল উদ্দিন বলখী, যিনি পরবর্তীতে জালালউদ্দীন রুমী এবং পাশ্চাত্যে জগতে রুমী হিসেবেই খ্যাত।

ইংরেজী ১২০৭ সালের ৩০ শে সেপ্টেম্বরে বর্তমান তাজিকিস্তানের খোরাসান অঞ্চলের বলখ প্রদেশে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার নাম ছিল বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ, যিনি একাধারে ধর্মতাত্বিক বিচারক ও সূফী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং মার নাম মুমীনা খাতুন যাদের পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে ইসলাম প্রচার কাজের জন্যে ছিল সামরিক পরিচিত।

পৃথিবীর অন্যতম বাস্তবতা যুদ্ধ ও অশান্তি। আর এ অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেবার লক্ষ্যে ইসলামের শান্তি ও মানবতাবাদী দর্শনকে তিনি গভীরভাবে আত্নস্ত করেছিলেন এবং মানুষে মানুষে প্রেম ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই সত্যের বাণীকে বিশ্বময় ছাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আর তার সেই প্রচেষ্টার অন্যতম ফসল হচ্ছে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মসনভী। মসনভী সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে এটা হচ্ছে আল কোরআনের সারমর্ম। মূলত আল কোরআনের সারবক্তব্যকে কবি তাঁর গল্প ও নীতিবাক্যের মাধ্যমে সাবলীলভাবে প্রকাশ করেছেন। এ কথার প্রচালিত আছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশে নীতিশাস্ত্র রচিত হয়েছিল “দীওয়ানে হাফিজ” এবং রুমীর মসনভী শরীদে ছায়া অবলম্বনে। সাম্প্রতিক কালে পশ্চাত্যে বিশ্ব মাওলানা। রুমীকে গভীরভাবে আত্নস্হ করেছে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর লেখার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি। আর এ প্রেক্ষাপটে UNESCO গত ২০০৭ সালকে মাওলানা রুমী বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ থেকে বোঝা স্পষ্ট যে যুগের জীর্নতাকে পেছন ফেলে রুমীর কবিতা আজ বড্ড প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

রুমীর কবি মানস বুঝতে গেলে তার রচিত ছয় খন্ডে সমাপ্ত মসনভী শরীফ আমাদের বেশ সাহায্য করতে পারে। আসলে স্রষ্টা প্রেমের উপর এত বড় মহাকাব্য পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় ও সাহিত্যে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। কাব্যকলার যত রূপ ও আঙ্গিক আছে তার সমাহার রুমীর কবিতায় বর্তমান। Epic/Lyric/ode/elegy অর্থ্যা কাব্যের যত রূপ এবং বিভাগ আছে তার সবই পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। রুমীর ভাষা, ছন্দ, শব্দ-চয়ন, উপসা রূপকল্প, প্রতীক তথা অলংকার শাস্ত্র প্রয়োগ ও ছন্দ প্রকরনে যে নৈপুন্য দেখা যায় তা আর কোথাও দেখা যায় না। তাই সারা বিশ্ব রুমীর কাব্য শ্রেষ্ঠত্বে এবং সাহিত্য এত মুগ্ধ ও অভিভূত।
মানবাত্বার ইতিকথা বর্ণনার মধ্য দিয়ে রুমী আমাদের অনন্ত জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। তার কাব্যের ছত্রে ছত্রে আমাদের আত্না জেগে ওঠে, অন্তরের অন্বেষায় আমাদের স্বত্ত্বা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। রুমীর কাব্যপ্রেরনা মূলত তাওহীদ ও রেসালাত ভিত্তিক। তিনি ইমানদার ও নেক আমলের কবি যিনি তাঁর অসাধারণ কাব্যপ্রতিভায় হেদায়েতের পথকে প্রশস্ত করেছেন।

কাব্যকলায় রুমী যে Art অবলম্বন করেছেন তা গভীরভাবে প্রানধানযোগ্য। সষ্ট্রার প্রতি আমাদের প্রেমকে প্রকাশ করার জন্যে তিনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তা হলো প্রেমস্পদের গোপন কথা লুকানো থাকা ভালো বিভিন্ন গল্পের মাধম্যে তা বলা যাবে। এবং গোপন কথা অন্যের কথা বর্তায় বলা যাবে। তুচ্ছ ঘাসের উপর পাহাড় রাখা যাবে না। সূর্যকে কাছে আনলে অস্তিত্ত্ব বিপন্ন হবে ইত্যাদি। তাই কবিতায় বিশেষত মসনভীতে অসংখ্য বাস্তব, কাল্পনিক কাহিনী, উপকথা নীতিগল্প রূপক কাহিনী, তার সাথে সংযোজিত করেছেন গভীর চিন্তা চেতনার স্রোত, যাতে স্রষ্টার প্রেমের ঝংকার মানুষ অনুভব করতে পারে Nicholson তাই রুমীকে The greatest mystical Post হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে রুমীর সেই প্রসিদ্ধ উক্তির কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি বলেছেন “আমি প্রস্তররূপে ছিলাম, সেখান থেকে উদ্ভিদ রূপে জন্ম নিলাম, উদ্ভিদরূপ থেকে প্রানীরূপে জন্ম নিলাম, মানুষ হিসেবে মৃত্যুর পর ফেরেশতা হব। তারপর আরো উর্ধ্বজগতের অস্তিত্ত্ব লাভ করবো, তারপর আমি অনন্তে বিলীন হয়ে যাবো। আমাদের Universal Existence বা বিশ্বজনীন অস্তিত্বের কথা বলতে গিয়ে রুমী বলেছেন “আমি সূর্য কিরণের কণা, আমি সূর্যের গোলক, আমি প্রভাতের আলো, আমি সন্ধ্যার বায়ু।” বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় রুমীর কবিতা, বিশেষত মসনভী অনুদিত হয়েছে নানাবিধ গবেষণা গ্রন্থ। যেমনটা কোলম্যান বার্কস লিখেছেন “The Soul of Rumi” ১২৭৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর কেনিয়াতে বিশ্ব কাব্যজগতের এ অসাধারন প্রতিভা ইন্তেকাল করেন এবং তাকে তার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

রুমী হয়তো শারিরীক ভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু একথা নিশ্চিত তাঁর কবিতা আজও বেশ জীবন্ত এবং ভাবময়। হৃদয়ের গভীর বোধ লোকে তাই বলতে দ্বিধা নেই রুমীর কাব্যপাঠের মাধ্যমে মানুষের মাঝে খোদা প্রেম, জীব প্রেম, মানব প্রেম যতই জাগ্রত হবে, হিংসায় উনুত্ত এই পৃথিবীর জন্য ততই হবে কল্যানকর ও মঙ্গলময়।


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…

রবীর উপর বাউলের প্রভাব



রবীর উপর বাউলের প্রভাব

কবীর হুমায়ুন

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের জীবন ও কর্ম-পরিধির আলোকে বাঙালী সংস্কৃতির সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। তাঁর ভেতর সর্বাধিক পরিমানে প্রকাশ ঘটেছে বাঙালীর সৌন্দর্যবোধ ও মননশীলতার উপাদানসমূহ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই রবির ন্যায় উজ্জ্বলতম। তাঁকে বাংলা ভাষা-ভাষীদের মাঝে পরিচয় করে দেয়ার প্রচেষ্টা মূর্খতা বা দৃষ্টতার সামীল। তবুও তাঁর পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে সবকিছু ছাপিয়ে একটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য বিশেষণকেই আমরা বেশি ব্যবহার করি ‘কবিগুরুর’। কবিগুরুও জন্ম ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে আর মৃত্যু ১৯৪১ এ। এই প্রায় আশি বছরের জীবনের সময়কালে বাংলাদেশ, বাঙ্গালী সমাজ, বাংলা সাহিত্য তাঁর অবদানে এতো ব্যাপকতম বিস্তৃত; তা পরিমাপের কোন মাপকাঠি অদ্যাবধি কোন বাঙ্গালী লেখক, সাহিত্যিক, কবি, সমালোচক, বা বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞজনেরা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হননি। বাংলা সহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান ইত্যাদি যেখানে করিগুরু রবীন্দ্রনাথের সফল পদচারনা পরিলক্ষিত হয় না। গুনগত ও পরিমানগত উভয়দিকে তিনি অপ্রতিদ্বন্ধী ও অনতিক্রম্য। বাংলা সাহিত্যের সূচনা লগ্ন হতে আজ পর্যন্ত কেহই তাঁর কর্ম পরিধিকে স্পর্শ করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাত্তের কবি সাহিত্যিকবৃন্দ কমবেশি সকলেই রবীন্দ্রনাথের আলোকচ্ছটায় প্রভাবিত। বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিশ্ব সাহিত্যের মর্যাদা এনে দিয়েছেন।
বৈশ্বিক সমাজে বাংলা ভাষাকে স্বকীয় প্রভায় উচ্চাসনে আসীন করেছেন ‘গীতাঞ্জলি’ এর নোবেল প্রপ্তির মাধ্যমে। এর পূর্বে বাংলা ভাষার রচনা-সেই চর্যাপদ হতে রবীন্দ্র-পূর্ব সাহিত্য, বাংলা ভাষার চিন্তা-চেতনার প্রকাশ যতই বলিষ্ঠ ও সমৃদ্ধশালী হোক না কেনো, বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা ভাষা ও বাঙালীদের স্বকীয় মর্যাদায় পরিচিত পায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য কর্মে, চিন্তা-চেতনায়, নিজস্বতায় বৈশ্বিক পরিমন্ডলে অনন্য হয়ে। পরবর্তীতে বাংলা ও বাংলা সাহিত্য আরও বিশ্বজনীন হয়ে উঠে। বিশেষ করে যাকে মাতৃভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রক্ত বিনিময় মূল্য দিতে কার্পণ্য করেননি এ ভাষাভাষীর যুবাপ্রাণ। তাই বর্তমানে বাংলা ভাষাকেই কেন্দ্র করে উদ্যাপিত হয় – ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অনন্য রচনা। যার প্রকাশ রবীন্দ্রনাথকে এনে দিয়েছে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সম্মান ও মর্যাদা। বাংলা সাহ্যিত্যকে এনে দিয়েছে বিশ্ব সমাজে আলাদা ভাবে পরিচিতি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে একটি সম্বৃদ্ধি ও বলিষ্ঠ তা প্রতিভাত করে তুলেছে বিশ্ব সাহিত্য সংস্কৃতি পরিমন্ডলে। এই গীতাঞ্জলি কাব্যেও অন্তর্গত অধিকাংশ রচনাই গান। এই সকল গান বা গীতগুলোর সাথে অনেকটা সাযুস্য খুঁজে পাই বাংলার বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর রচনার সাথে। খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলে মনে হয় গ্রাম্য শব্দ বিন্যাসের ভাবধারা ও চেতনাগুলো পরিশীলিত ভাষায় পরিমার্জিত রূপে প্রকাশিত হয়েছে গীতাঞ্জলিতে।
ফকির লালন শাহ স্বয়ং মহা ভাব সমুদ্র। তিনি মাতৃযোনি সম্ভূত সাধারণ মানব সন্তান হলেও একটি আদর্শিক ভাবধারা নিয়ে দার্শনিকতার জগতে আতœমুক্তির একটি পন্থায় জীবন পরিচালনার মহামন্ত্র প্রচার করে গিয়েছেন। তখনকার ধর্ম ভিত্তিক খন্ড-বিখন্ড সমাজ ব্যবস্থাকে ঐক্যসূত্রে বাঁধার পরিকল্পনার মহা প্রয়াস নিয়ে লালন শাহ সমাজে তৈরী করেছেন একটি ভাবদর্শন। যাকে লালন দর্শন বা বাউল-দর্শন অভিধায় আক্ষায়িত করা হয়ে থাকে। লালন শাহের বাণী বা কালামের (লালন শাহের গানের কলিকে লালন ভাবাদর্শে আদর্শিত বা লালন ভক্তগন ‘কালাম’ বলে অভিহিত করে থাকেন। তাই আমিও এ লেখার অনেক স্থানে সেইভাবে উল্লেখ করেছি।) লালন গীতির কোন লিখিত রূপ লালন সাঁইয়ের স্বহস্তে না থাকার কারণে তাঁর ভাব শিষ্যদের কন্ঠে বা খাতায় মূল ভাবাদর্শেও রূপখানি অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গিয়েছে। এমনকি তাঁর দেহান্তরের পরে বহু সংগ্রাহক সংকলকগনও সংশোধনের নামে যথেচ্ছা বিকৃত ঘটিয়েছে। তথাপি লালন প্রেমিক বা লালান ভাবাদর্শে বিশ্বাসীগণ লালনের কালামকে অর্থাৎ লালন সঙ্গীতকে- তাঁর দর্শনকে বা লালনের স্বকীয় প্রভাময় ভাবাদর্শকে বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে ধরে রাখার অনেক চেষ্টা ও কষ্ট করেছেন। বহু ত্যাগ-তিতীক্ষা ও শ্রম ও সময় ব্যয় বরেছেন। তাঁরা সংখ্যায় অনেক। সেই ফকির লালন শাহের জীবনকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি সেই সকল জ্ঞানী অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিগণ কর্ম প্রয়াস চালিয়ে আসছেন। ঐ সকল জ্ঞানী অনুসন্ধিৎসু সংগ্রাহক ও সংকলকদের মধ্যে আমরা পরম শ্রদ্ধাসাথে একজনকে বিশেষভাবে স্মরণ করতে পারি। তিনি হলেন মহৎ প্রাণ করিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি মহারাজ ফকির লালন শাহের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা আর গুরু ভাবজ্ঞানে লালন সঙ্গীতের সংগ্রহক ও সংকলক রূপে নিঃসন্দেহে এর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন।
ফকির লালন শাহের জন্ম, সম্প্রদায় পরিচয় নিয়ে লালন গবেষকদের মাঝে ব্যাপক মতবিরোধী বিতর্ক, এমনকি পরস্পর বিরোধী অমীমাংসিত এক জটিলতর বিবিধ এখনো চলে আসছে। কিন্তু লালন শাহের জন্ম বা জাতের কোন পদবী যোগ করেননি। তাঁর নামের আগে বা পিছে। মানুষ ও মানুষের আতœা পরমাতœার কাছে জাত-পরিচয় তাঁর কাছে ছিল অতীব গৌণ। তাঁর ভাষা,-
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।
লালন কয় জাতের কী রূপ,
দেখলাম না এই নজরে।’
অথবা
‘সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন।
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান।’
লালন সাঁই সব সময় বিলীন থাকতেন পরমাতœার মাঝে। আর সেই অসীম পরম আতœার মাঝেই খুঁজে বেরিয়েছেন মানবসত্ত্বার মানুষকে। মানবতাই তাঁর নিকট ছিল বিশেষ গুরুত্ববহ। তাই তিনি সহজেই বলতে পারতেন প্রচলিত ধর্ম মানুষের মাঝে বিরোধের সৃষ্ঠি করে। পরমাতœার সাথে মানুষের একাতœ হওয়ার ধর্মই মানবতা ধর্ম। যা মানবাতœার দিব্যজ্ঞানের পরিচায়ক। তাঁর ভাষায়-
‘ডানে বেদ, বামে কোরান,
মাঝখানে ফকিরের বয়ান,
যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান
সেহি দেখতে পায়।
আর এই বাণীর দ্যোতনা খুঁজে পাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। তিনি সীমাবদ্ধতার ভেতর খুঁজেছেন অসীমের আলোক রশ্নি। অন্য এক ধরনের ভাব দর্শনে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন অসীমত্বের মাঝে অস্তিত্বের সন্ধান। বিশালতের মাঝে খুঁজে ফিরেছেন স্বীয় আতœার অস্তিত্ব। পরমের মাঝে বিলীন হওয়ার আনন্দ রাশি। তাই তিনি লেখনীর তুলিতে ছাপিয়ে তোলেন সেই আকাঙ্খার সুর ও ছন্দ
‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি
বাজাও আপন সুর।
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর।
কত বর্ণে কত গন্ধে
কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ, তোমার রূপের লীলায়
জাগে হৃদয়পর।’
কালজয়ী মহা পুরুষ ক্ষণজন্মা বাউল ফকির লালন শাহকে স্থান-কাল সীমানায় আবব্দ করে তাঁর কর্মপ্রয়াসের চেতনার ভাবগাস্তীর্যের ও দার্শনিকতার রসবোধ আস্বাদন করার চেষ্টা চরম মূর্খতার সামীল। তিনি স্থান-কাল উর্ত্তীর্ণ মহা সত্যময় এক দর্শনের উদ্গতা। লালন শাহের প্রয়ান ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দে হলেও তাঁর জন্ম ১৭৭৫-১৭৭৭ সালে। শতাধিক বছরের জীবন ধারার পথ পরিক্রমায় উখিত লালনাদর্শের ভাবধারায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বিপুল ভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
অনন্ত কালচক্রের নানা পর্বে লোকাস্তরের মহাপুরুষগণ ধীর-স্থিরতা, ভারসাম্য ও শান্তি পূণঃ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এ জগতে জন্ম গ্রহন করেন। সেই সকল মহা মানবগণ তাঁর চেয়ে অধিকতর শান্তিধর, গুণধর বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের কাছে নিজেকে সমর্পন করে থকেন। আর, এই আতœ সমর্পন নীচতা নয়; হীনতা নয়। এ হলো শক্তির উন্মষ। সেই শক্তি হলো ভক্তির শক্তি। শক্তিহীন অবস্থায় যেমন শক্তিমানকে স্পর্শ করা যায় না; ক্ষুদ্রতা দিয়ে যেমন বৃহৎকে বুঝা যায়না; পরম সত্যকে তেমনি খন্ডিত বিচারবুদ্ধি বা সংকীর্ণতা দিয়ে অনুধাবন করা যায় না। এমনটিই ঘটেছে ফকিররাজ লালান শাহের মূল্যায়ন প্রচেষ্টায়। তাই হয়তো বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং লালন দর্শনের শক্তির মূল্যায়ন সর্বপ্রথম অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথাসাধ্য পরিমার্জনা করে ফকির লালন শাহের কুড়িটি গান সংগ্রহ বলে সর্বপ্রথম ‘প্রবাসী পত্রিকায় ১৯০৫ সালে (১৩১২ সালেরে আশ্বিন সংখ্যায়) “হারামনি” বিভাগে প্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ কবিগুরুর চিন্তা- চেতনায় বাউল লালন শাহের সঙ্গীত সম্পদ ছিল অমূল্য সম্পদ। তাই “হারামনি” শিরোনামে স্থান পেয়েছিলো লালনগীতি। আর তখন থেকেই কোলকাতা কেন্দ্রিক শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একাংশ ‘গ্রাম্য’ ‘অশিক্ষিত’ এ বাংলাদেশে-বাংলা ভাষার লালন দর্শন নামে অদ্বিতীয় অবিসরনীয় একটি দর্শন আছে, যা সাধারন মানুষের চেতনায় মননে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলছে, তা অবগতি হলেন। লালন সঙ্গীতের দার্শনিক ও নান্দনিক প্রভাব যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে তুলেছিলো-তেমনি শহওে শিক্ষিত সমাজকে নাড়া নিয়ে গেলো। শুধুমাত্র কোলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজ নয়; লালন দর্শনের আধ্যাতিœকতা, ভাবগাম্ভীর্য ও মাহাত্তের গুঢ়তায় বিমোহত হয়েছিল সকল শিক্ষিত ও জ্ঞানী সমাজ। ক্রমে ক্রমে তা বিশ্বজনীনতায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। লালন দর্শন ভারত-বাংলাদেশের গন্ডি ছেড়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানী, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশেই লালন দর্শনের গঠন পাঠন ও চর্চা চলতে শুরু হরে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়- ‘আমার লেখা যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই লেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হতো। আমার অনেক গনে আমি বহু সুর গ্রহন করেছি এবং অনেক গানে অণ্য রাগরগিনীর সাথে আমার জ্ঞান বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স-শিলাইদ (কুষ্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল-
‘কোথায় পাবো তাঁরে-আমার মনের মানুষ যেঁরে।
হারায়ে সেই মানুষে-তাঁর উদ্দেশ্যে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে॥’
(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস। বাউলগণ পরমেশ্বরকে নারী-জ্ঞানে ভালোবেসে, শ্রদ্ধায়, ভক্তি-প্রেমে অন্তরে তাঁর সান্যিধ্য প্রাপ্তির লাভের আশায় হৃদয়ের সমস্ত চেতনা, আবেগ মস্থিত সুরাশ্রয়ে বিমোহিত হয়ে আকুলিত প্রাণে সুর তুলে থাকেন।)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের ভাষায় ঐ বাউলের গানের কথা ও সুরের মাধুর্য আমাকে এতোই বিমোহিত করেছিলো যে, আমি সেই সুর ও ছন্দে বাংলাদেশকে মাতৃরূপ জ্ঞানে লিখেছি-
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি,
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি॥;
যা বর্তমানে রক্তস্নাত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় সঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে মাতৃ-জ্ঞানে ভালোবেসে, শ্রদ্ধায় ভক্তি-প্রেমে, অন্তরে সমস্ত চেতনায় লালন শাহের সুর ও ছন্দে রচনা করেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। অর্থাৎ, আমাদের রক্তের ঝর্ণাধারার বিনিময় অর্জিত জাতীয় সঙ্গীত ভাষা ও শব্দ বিন্যাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দৃশ্যমান হলেও; সুর ও ছন্দে এবং প্রেরণার উৎস হিসেবে বাউল সম্রাট লালন শাহের অবদানকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
কুষ্টিয়ার বিশেষভাবে শিলাইদহে কবিগুরু বাউলের সাথে সাধুসঙ্গ করেছিলেন বলে তিনি যে উল্লেখ করেছেন তা মূলতঃ ফকির লালন এবং তাঁর ভাবদর্শনের অনুসারীদেরকেই বুঝিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হৃদয় থেকে ফকির লালন শাহকে গুরুরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যা তাঁর সাহিত্য দর্শনে স্পষ্ট। বিপুল এ বিশ্বে ঈশ্বরের অবস্থানই মানুষের অস্তিত্ব। পরমেশ্বরই মানুষকে কৃষ্ণগহ্বর হতে দেখিয়েছেন আলোকের পথ। অদৃশ্য শক্তির প্রতি বিশ্বাসের মূলমন্ত্রই ফকির লালন শাহের ধর্ম দর্শন। আর তাঁ ধর্ম দর্শন অভিব্যক্ত হয়েছে অবিনাশী পদাবলীর সঙ্গীতের ফল্গুধারায়, স্বর্গীয় ব্যঞ্জনায়। লালন সাধক। তিনি একজন তত্ত্বজ্ঞা মহাকবি। আর তত্ত্ব সাহিত্যের সবচেয়ে বড় কথা আতœতত্ত্ব। এ দর্শনই লালন সাহিত্যের প্রাণ। সঙ্গীতের জন্ম বা উদ্ভব হয়েছে ধ্যান সাধনা থেকে। আতœদ্রষ্টা মহাপুরুষগণই সঙ্গীতের আদি জনক। ভারতীয় দর্শন, ঈশ্বরের চেতনা রবীন্দ্রনাথ তুলে এনেছিলেন শ্রীমদভগবদগীতা হতে। যা বিস্তৃত হয়েছে গানের সুর ও ছন্দে ‘গীতাঞ্জলি’তে। আর এ গীতাঞ্জলির প্রতি ছন্দে ছন্দে খঁজে পাওয়া যায় ফকির লালন শাহের সঙ্গীতের বা লালন দর্শনের মূল ভাবাদর্শের পরশ। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির গীতধারায় যদি আমারা আধ্যাতিœকতার চেতনায় নিবিষ্টতায় রসাস্বাদন করি ত’হলে আমরা দেখবো যে লালনের দর্শনের বা লালন কালামের পরিশীলিত রচনার ধারাবাহিকতা।
লালনের কালামে বিনয় ও মানবীয় আমিত্ব শূন্যতার এক কৌশল মাত্র। গুরুর চরণে নিজেকে অধম ও গুরুত্বহীনভাবে তুলে ধরে গুরুকে সর্বোত্তমরূপে প্রকাশ করার এক কৌশল সাঁইজী তুলে ধরেছেন তাঁর সুরে ও কালামে। পরম আতœাকে কল্পনা করেছেন গুরুর ভনিতায়। সেই কথাই যেন আমরা শুনতে পাই কবিগুরু রবী ঠাকুরের কন্ঠে-
‘তুমি কেমন করে গান কর যে, গুণী,
অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি।
সুরের আলো ভূবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।’
রবিন্দ্রনাথ অরূপের (নিরাকার) অপরূপ রূপে অবগাহনের নিমিত্তে অতল রূপ সাগরে ডুব দিয়েছেন অরূপ রতন (অমূল্য রতন) আশা করি, তাঁর ভাষায়-
‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি
অরূপ রতন আশা করি;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর
তাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয় রে এবার
ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার
সুাধায় এবার তলিয়ে গিয়ে
অমর হয়ে রব মরি।’
আর লালনের দার্শনিকতায় প্রবাহমান গুনরাজির অসীমান্তিক মহা ভাব-সাগরে সাঁতার কেটে জানিনা কতুটুকু ছুতে পারবে অমূল্য সেই নিধি। তিনি দয়াল, এই ভরসায় বাঞ্ছা করি তাঁর মহানাম কীর্তনের এ মহাসত্যই লালন দর্শনের আদিপাঠ। লালনের কালামে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রূপ সাগরে ডুব দিয়ে অরূপ রতন পাওয়ার আকাঙ্খার অনেক পূর্বেই। লালন তাঁর একতারার তারে সুরে ও ছন্দে গেয়ে গেছেন।
‘রূপের তুলনা রূপে।
ফণি মণি সৌদামিনী
কী আর তাঁর কাছে শোভে॥
যে দেখেছে সেই অটল রূপ
বাক্ নাহি তার, মেরেছে চুপ।
পার হলো সে এ ভবকুপ
রূপের মালা হৃদয়ে জপে॥
এই রূপের তুলনা মানবসত্ত্বায় নিহিত বস্তমোহমুক্ত নিষ্কামী মহা মানবের স্বরূপ। যে মহা মানব সম্যক গুরুদেবের কাছে সম্পূর্ণ আতœ-সমর্পিত চিত্তে কঠিন ধ্যানব্রত অবস্থায় শিক্ষা গ্রহন করেন। যেখানে অরূপে (অস্তিত্বহীনতায়) খুঁজে ফেরে রূপের সন্ধান। যেখানে নিজেকে জানা এর জন্য পরিপূর্ন আতœদর্শনে ব্যাপক থাকে। লালন তাঁর তত্ত্ব সহিত্য নতুন কিছুই বলেননি। যুগে যুগে মহা পুরুষ, অবতার, পয়গম্বর বা ঈশ্বরের প্রিয় ব্যক্তিগণ যা বলেছেন, সেই সকল বাণীই তার সুরধ্বনীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে। আমিত্বের উৎসর্গ সাধন করা- এ ধারায় আপন মনের জাগতিক লোভ লালসাময় কঠিন আসক্তির বন্ধন ছিন্ন পরিশুদ্ধ স্বাত্ত্বিকতা অর্জনের নিমিত্তে আতœ দর্শনের শিক্ষাদান করাই লালন দর্শনের সারকথা। অর্থাৎ, সক্রেটিসের দর্শনে- কহড়ি ঞযুংবষভ নিজেকে জান। সিদ্ধার্থ গৌতমের বার্ণ- ‘আতœনং বিদ্ধি’- আপনাকে জ্ঞানী করে তোল। সনাতন ধর্মালম্বীদের (হিন্দু ধর্মমতে) চেতনায় যাকে বলে, ‘নিঃশ্রেয়স’- আতœার বিশুদ্ধ উন্নতির মাধশ্যে মোক্ষ লাভ করন। আর ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম- তাঁহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক) আর বাণী-‘মান আরাফা নাফসাহুম ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’-যে নিজেকে চিনেছে বা নিজেকে ধ্যান করেছে, সে পরমাতœা বা ঈশ্বরকে চিনেছে। সেই কথাই ফকির লালন চেতনায় বেজে উঠেছে হাজার কথায়, বিবিধ সুরে। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল ধর্মের উৎস চেতনা পরিশুদ্ধ আতœার অনুসন্ধান করা। যার মাধ্যমে পরমাতœার সান্নিধ্য লাভের প্রচেষ্টায় ব্রতী হওয়া। তাই লালন ফকির দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করেছেন-
‘যার আপন খবর আপনার হয় না।
একবার আপনারে চিনতে পারলেরে
যাবে অচেনারে চেনা ॥
আতœারূপে কর্তা হরি,
নিষ্ঠা হলে মিলবে তাঁরই ঠিকানা।
ঘুরে বেড়াও দিল্লি লাহোর
কোলের ঘোর তো যায় না ॥
ধর্ম তত্ত্বে পরমাতœা বা ঈশ্বরকে অনুসন্ধানের জন্য বৈরাগ্য সাধন প্রক্রিয়ার বনে-জঙ্গলে, পাহার-পর্বতে, অথবা মক্কা-মদিনাতে যাওয়ার তাগিত অনুভব করেনি লালন শাহ; তেমনি তাঁর ভাবশিষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালন দর্শনের মতোই ঈশ্বরের মহিমা খুঁজে ফিরেছেন মানুষের মাঝে। মানুষই ঈশ্বর, মানুষই দেবতা, মানুষের মাঝেই পরমাতœার অস্থিত্বলীন। তাই লালন শাহের কন্ঠে যেমন শুনি-
‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার ॥
নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে
যে জন দিব্যজ্ঞানী হয়, সেহি জানতে পায়
কলি যুগে হল মানুষ অবতার ॥
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের ভাব দর্শনের দ্যোতনাকে আরও উচ্চমার্গ্মে তুলে ধরেছেন। মনে হয় লালনের চিন্তা-চেতনাকে শারীর ও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন স্বয়ং কবিগুরু। মার্জিত ভাষায় পরিশীলিত সুরের মাধুর্য দিয়ে কবিগুরু একতারার সুরের স্থানে বীণার তালে ঝংকৃত করেছেন মানব ও মানবতার মাঝেই পরমাতœার অস্তিত্ব। সেই পরমাতœাকে পেতে হলে আমিত্বের অহংবোধ লীন করে দিতে হবে মানুষ-গুরু সাধনে; মানবতার পরাকাষ্ঠা দেদীপ্যমান করে। কবিগুরু ভাষায় তা হলো-
‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাক পড়ে
রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস ওরে।
তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙ্গে
করছে চাষা চাষ-
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বারো মাস।
রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,
ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে-
তাঁরই মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয় রে ধুলার ‘পরে।’
অপরদিকে, ফকির লালন শাহ মানবদেহে নিহিত আলোকিত সত্তার উন্মেষের ইচ্ছার স্বীয় কন্ঠে উচ্চারণ করেন-
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া মনের আমার
দেখিরে সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার
ভজলে পাবি ॥
লালন ফকির তাঁর পরমাতœার সাথে মিলনের প্রচন্ড আকাঙ্খা তাঁকে উন্মাতাল করে রাখতো, তাই সে প্রভুর সাথে মিলনের আকাঙ্খায় বেদন সুরে গেয়ে বেড়ায়-
‘মিলন হবে কতোদিনে।
আমার মনের মানুষের সনে ॥
ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়
থাকে না লোক লজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে ॥
প্রভুর সাথে মিলনের ইচ্ছা লালনকে যেমন চাতক প্রায় জোছনালোকের প্রত্যাশায় দিন গুনতে, তেমনি প্রভুর সান্নিধ্য পাবার আশায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল হৃদয়ে গাইতেন-
‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু,
এবার এ জীবনে,
তবে তোমায় আমি পাইনি যেন,
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।’
অথবা
‘আমার মিলন লাগি তুমি
আসছ কবে থেকে।
তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায়
রাখবে কোথায় ঢেকে।
কত কালের সকাল-সাঁঝে
তোমার চরণধ্বনি বাজে
গোপনে দূত হৃদয়-মাঝে
গেছে আমায় ডেকে।’
বাউল সম্রাট লালন ফকির এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এ দু’জন মহৎ-প্রাণ ও সাধুর কর্ম ও রচনার কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করেছি বটে। লালন শাহের প্রয়াণের সময়কালে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ যৌবনকাল। তখন তাঁর বয়স ২৮/২৯ বছর। যে ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এবং বাংলা ভাষাকে অনে দিয়েছে সুনাম, সম্মৃদ্ধি ও বিশ্বজনীনতা। সেই ‘গীতাঞ্জলি’ প্রতিটি ‘গীত’ ধরে-স্থীরতার সাথে পাঠ করলে নিজের অজান্তে মনে হবে- এ কথাগুলো তাঁর পূর্ব-পুরুষ বাউল কবি ফকির লালন শাহ আগেই বলে গেছেন। অর্থাৎ, ‘গীতাঞ্জলি’র গানগুলো লেখার সময় কবিগুরু প্রচন্ডভাবে বাউল কবি লালনের রজনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল এর মতো পুরস্কার ও সম্মানের পিছনে লালন দর্শনের প্রভুত অবদান বিদ্যমান। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেভাবে দুই বাংলায় বাঙ্গালীগণ উচ্ছাসিত ও উদ্বেলিত হয়ে স্মরন; সেইরূপ হয়না বাউল সম্ম্রাট লালন শাহের ক্ষেত্রে।


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…