মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে



-এস জে রতন
ত কিছু করতে যে চায় মন।
করে আনচান হৃদয়, ।
খন্ডিত বা আংশিক নয় ।
পুরো প্রাপ্তিতে প্রতি অনুক্ষণ;
থলে ভরা কচকচে কয়েন ।
মন আকুলি খরচের লাগি ।
কেহ নাহি নিয়ন্ত্রিত জীবন মাগি।
মানে, শ্রদ্ধায় বড়, যিনি নিয়ন্ত্রিত রহেন।
হঠাৎ বৃষ্টি। কাঁধে ঝোলানো অফিসের ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে করতেই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। এমন শীতের মৌসুমেও যে হঠাৎ করে বেরসিক বৃষ্টি নামতে পারে, ভাবনাতেও ছিল না। ছাতাটা চারফোল্ডিং-এর ছিল। ছাতার বাঁটের বাটনে চাপ দিতেই আচমকা বাতাসে পটাস শব্দে ঝুরঝুর করে দু’শো পঞ্চাশ টাকার ছাতাটির সকল কল-কব্জা, ডানা ভেঙ্গে চুরমার হলো। আপাতত অকাল মৃত্যু হলো ছাতার। যে উদ্দেশ্যে ছাতা ব্যাগে করে কবে বৃষ্টি আসবে তার আশঙ্কায় প্রতিদিন বয়ে বেড়ানো, সেই ছাতাই কি না সময়ের প্রয়োজনে বিগড়ে গেল। মেজাজটা তেতিয়ে উঠলো। কষ্টে, দু:খে ভিজেই অফিসের বাকিটা পথ হাঁটা শুরু করলো তমাল।

তারপর হাঁচি পর হাঁচি। এ যেন হাঁচি নয় একেকটা গ্রেনেড বিস্ফোরণ। সারাদিন ভেজা শার্ট-প্যান্ট শরীরের তাপেই শুকায়। রাত্রে ভীষণ জ্বর, কাশি, ঠান্ডায় বুক ধরে আসছিল। সামান্য ধৈর্যচ্যুতিতেই এ অবস্থা হলো তমালের। সেদিন বৃষ্টির সময় কাছের কোন দোকানে বা কোন শেড-এ একটু সময় দাঁড়ালেই হয়তো এই অসুস্থতাটুকু এড়িয়ে যাওয়া যেত। অল্প নিয়ন্ত্রণহীন হওয়াতেই যা হলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হলে কি হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ফেইসবুকে সত্য মিথ্যের মিশেল নতুন কিছু নয়। কোন তথ্যটি যে সত্য আর কোনটি যে মিথ্যে তা নির্ণয় করা খুবই মুশকিল কাজ। আলফ্রেড নোবেল তার আবিষ্কারের অপব্যবহার রোধে ভাল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। মার্ক জুকারবার্গ ফেইসবুকের মাধ্যমে তথ্যাদি আদান-প্রদান করে একে অপরের সাথে সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিপরীত মানসিকতা আর অনিয়ন্ত্রিত বাসনা কেন যেন প্রকৃত তথ্য দিতে কুণ্ঠিত করে আমাদের। তাই হরহামেশাই মিথ্যের আশ্রয় নেয় মানুষ। মানুষের এই অপইচ্ছের বিপরীতে আছে সুনিয়ন্ত্রিত আর পরিকল্পিত জীবন। রায়হান দু’বছর হলো একটি সরকারী ব্যাংকে সিনিয়র পদে কাজ করছেন। মেধাবী বলে এই চাকরিটা পেতে তার খুব বেগ পেতে হয়নি। আরো কয়েকটা ভাল চাকরীর অফার আছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে জয়েন করলেই হয়ে যায়। রাত্রে মেসে ফিরে ল্যাপটপে ফেইসবুকটা যেন বাড়তি আনন্দ দেয় তাকে। সদ্য ছেড়ে আসা ভার্সিটির কিছু বন্ধু-বান্ধবি আছে ফ্রেন্ড লিস্টে। তাদের সাথে পারিবারিক, অফিসিয়াল, মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন ভাললাগা মন্দলাগার বিষয়গুলো শেয়ার করেন। রশ্মি নামের এক বান্ধবির সাথে ইদানিং চ্যাটিংটা বেশি হচ্ছে। রশ্মিকে সে চেনে ভার্সিটি জীবন থেকেই। কিছুদিন পাঁচ-সাতজন বন্ধুর সাথে এক হয়ে এক শিক্ষকের কাছে ফিন্যান্স পড়ার সময় ঐ মেয়েটিকেও কাছ থেকে চেনা হয়। কিন্তু তখন বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই মুখ্য ছিল। তখন অন্য কিছু ভাবার কারো কোন সময় বা ইচ্ছে ছিল না। তারপর একে একে সবার বিভিন্ন অফিসে চাকরী হয় আর ফেইসবুকে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ফেইসবুকের সব তথ্য যে রায়হান বিশ্বাস করতো তা কিন্তু নয়। তবে কিছু কিছু তো বিশ্বাসযোগ্য হতেই পারে। চাকরী আর ব্যস্ততায় রশ্মি এবং রায়হানের মধ্যে দেখা করা সম্ভব হচ্ছিল না। দেখা করার ব্যাপারে রশ্মির আগ্রহও কম ছিল। রায়হান এমনিতেই খুব নিয়ম মেনে চলা ছেলে। যথা সময়ে গোসল, নাস্তা, অফিস যাওয়া, খাওয়া, পড়ালেখা, বিনোদন সব কিছুতেই একটা নিয়ন্ত্রণের ছাপ আছে তার। কিন্তু হঠাৎ কেন যেন অফিস শেষে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হওয়া বা খাবারের আগে যেন ফেইসবুকটাই আগে চেক করে দেখতে হবে, যে কে কে তাকে কি ম্যাসেজ দিল বা কি চ্যাট করলো বা কারা কারা চ্যাটে বা অনলাইনে আছে। নেশার মতই হয়ে গেল প্রায়। বুঝতে পারলো এটা নেশায় রূপ নিচ্ছে, বিশেষ করে রশ্মির সাথে চ্যাটিং বেড়েই চলেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাটিং চলছে। ইচ্ছে করলেই কল করে মনের সব কথা জানানোর সুযোগ থাকলেও সেটা না করে শুধু চ্যাট করে সময় কাটাতে থাকলো তারা। একসময় রশ্মিকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিল রায়হান। রায়হানের মতো স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন ছেলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এমনটা ভাবা তার অভিভাবকদের কাছে যথার্থই মনে হতে পারে।

ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছে, ছেলের জন্য মা পাত্রী দেখছেন। ছেলেকে বিভিন্ন জায়গায় মেয়ে দেখাতেও নিয়ে গেছেন। কোন মেয়েই তার কাছে পছন্দসই হচ্ছে না। আবার রায়হান তার পছন্দের কথাও বলতে পারছে না। একদিন রশ্মির সাথে চ্যাট করে সিদ্ধান্ত হলো যে তারা কোন এক রেস্টুরেন্টে দেখা করবে। রায়হানের সাথে বাবা মা বোনও ছিল। এটাই প্রথম দেখা হবে রায়হান আর রশ্মিও মধ্যে। রায়হান তার বাবা মা বোনকে না করেছিল যেন প্রথম দেখাতে তারা না থাকেন। কিন্তু নাছোড় বান্দা সবাই, আর রায়হানের কাছে রশ্মির কথা শুনতে শুনতে যেন ব্যাপারটা এমনই হয়েছিল যে রশ্মির সাথে সবার কতো পরিচয় আছে আর সাক্ষাৎ হয়েছে। সবাই রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করছে। আইফোনে চ্যাট চলছিল। -আমরা অপেক্ষা করছি তোমার সাথে দেখা করবো বলে। – ওকে কাছেই এসে গেছি। এক্ষুণি ঢুকবো। -ঠিক আছে। -না ঠিক নেই। -কেন? -আমার পক্ষে তোমাদের সাথে দেখা করা সম্ভব না। রশ্মি নামের যে মেয়েটি এতদিন রায়হানের সাথে চ্যাট করতো সে সদ্য ইন্টার পাশ করা একটি ছেলে। তার কোন এক পরিচিতার নাম ব্যবহার করে মেয়ে সেজে এতদিন চ্যাট করেছে। রেস্টুরেন্টে ঢুকে রায়হান ও তার পরিবারের সবাইকে খুব কাছে থেকে দেখে, বসে সময় নিয়ে চ্যাট করে জানাচ্ছিল তার এই অপারগতার কথাগুলো। রেস্টুরেন্ট জমজমাট। সন্ধ্যার সময়। অফিস বা ক্লাস বা কাজ সেরে সবাই এই সময়টাতে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। বোঝার কোন উপায়ই থাকলো না যে কোন মেয়েটি বা মানুষটি রায়হানের সাথে চ্যাট করছে। চ্যাট চলছে।

-কি হয়েছে রশ্মি? আমাকে খুলে বলো! -না, বলতে পারবো না। তবে এটা আমার অন্যায় হয়েছে। এতটুকু শুধু বলতে পারি, আমি আসলে রশ্মি না। আপনার সাথে মিথ্যে করে মিথ্যে তথ্য দিয়ে এতদিন মজা করার জন্য এগুলো করেছি। রায়হানের সারা জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা, সফলতা, চৌকসপনা, বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তেই উবে গেল যেন। ভাবতেই পারছিল না যে কেন কোন মুহূর্তের জন্যও তার কাছে স্পষ্ট হলো না যে সে কোন নারীর সাথে চ্যাট বা যোগাযোগ করছিল না। নিজেকে যারপর নাই খুব বোকা মনে হলে লাগলো। বিশেষ করে এমন সিরিয়াস ব্যাপারে যে বোকা হতে পারে মানুষ তা যেন তার মস্তিষ্কেই ঢুকছিল না। রায়হান স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবা মা বোন জিজ্ঞেস করলো -কি হলো? -না, অ্যাকসিডেন্ট, সে আসতে পারবে না। পরে বলছি। চলো বাসায় চলো। রায়হান নিজের কাছ থেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তাই এতো বড়ো বোকা সাজতে হলো। আবেগ, সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা আর গুরুত্ব দেয়ার বিষয়গুলো হয়ে উঠলো অর্থহীন।

সাগরকে সবাই চেহারায় ফিট বলেই স্মার্ট বলত। স্মার্ট হবার জন্য আরো যে বিষয়গুলো আছে তা পরিমাপ করার আগেই বিশেষ করে মেয়েরা তাকে সহজ কথায় স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম বলত। এটাকে পঁূঁজি করে সাগরও কম যেতো না। সাগরের বুকে যেমন সব নদীরা এসে মেশে। তেমনটি প্রেমিকার সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না সাগরের। খাওয়া দাওয়ায় একটু নাক সিটকানো ভাব আর বেছে বেছে খাওয়ার অভ্যাসই নাকি সাগরের শরীর ফিট রাখার মন্ত্র। পার্কে, সাইবার ক্যাফে, কম্পিউটার ল্যাবে, সিনেপ্লেক্সে, আড্ডায় বেশি দেখা গেলেও রেস্টুরেন্ট বা খাবারের কোন আয়জনে কমই দেখা যেত। হঠাৎ এক অসুস্থতার কারণে তাকে বেশি পরিমাণে আমিষ ও ¯েœহ জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিলেন ডাক্তার। মাস দুই সেই অসুস্থতা কটিয়ে উঠে স্বাভাবিক হলো। কিন্তু ততদিনে খাদ্যাভাসটা যেন বদলেই গেল। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কিছুটা হলেও শিথিল হলো। বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন সবাই বলল- মাত্র তো অসুখ থেকে সেরে উঠলি, একটু ধৈর্য ধর, তারপর শরীরটাকে আবারো ফিট করতে পারবি। সেই যে শুরু হলো। এখন সাগরকে চিনতে গেলে ভূড়ি আর বিশাল দেহ দেখে চিনতে হয়। নিয়ন্ত্রণ এমন একটা বিষয় এটা ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে থাকলে তাকে ফিরিয়ে আনা দুষ্কর হয়। তারপরও পরিকল্পনা, ধৈর্য আর সংকল্প মানুষকে যে কোন অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই সুযোগটি থাকে। সেই জন্য দরকার আত্মসমালোচনা, ধৈর্য, একাগ্রতা আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এটা থাকলে অসাধ্যকে সাধ্য করা সম্ভব।

ছোট্ট শিশু রাব্বি। একটা লাল পিঁপড়া তার বাহু বেয়ে হাতের কব্জির দিকে নামছিল। হঠাৎ বিষাক্ত কামড়। অপর হাত দিয়ে মলে দিল রাব্বি। মাকে বলল- মা পিঁপড়া। মা কাছে এসে দেখলো বেশ ফুলে গেছে রাব্বির হাতটা। ছোট্ট লাল পিঁপড়াটি আধ মরা হয়ে ফ্লোরো পড়ে আছে। রাব্বির ফুলে যাওয়া হাতের স্থানে বাম লাগাতে লাগাতে তার মা খেয়াল করলো, পিঁপড়াটি একটু ছটফট করে শান্ত হলো। তারপর তার শরীরটা ব্যায়ামের মতো করে ঠিকঠাক করে নেবার চেষ্ট করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে শরীরটা ঠিক হলো। ধীরে ধীরে আহত শরীরটাকে টানতে সক্ষম হলো। এক পর্যায়ে বেশ জোরে সোরেই হাঁটতে পারলো। রাব্বির মা’র চোখ কতক্ষণ আটকে ছিল এই ঘটনাটি দেখার তা মনে নেই। তবে পিঁপড়ার পুনর্বার জেগে ওঠা, শক্তি সঞ্চয় করা, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ রেখে স্বকাজে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটি মুগ্ধ করলো। দেখতে ইচ্ছে করলো বার বার কত অল্প সময়েই পিঁপড়ার কাছ থেকে মানুষের একটি বড় সময়ের জীবনের শিক্ষা আহরণ করা যায়।

তমাল স্বভাবতই গানের লোক। গানের সাথে ভাললাগা আর পবিত্রতার বিষয়টি মৌলিকভাবে গ্রথিত থাকলেও, এই গানকে ঘিরে যা কিছুই হচ্ছে সবই যেন সভ্য সমাজে মানার মতো মনে হয় না। তাই ছোটবেলায় সবারই লক্ষ্য থাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবার। শিল্পী হবার নয়। তমালের অফিসে এক গানের শিল্পী তার এলাকার এক বড় ভাইকে সাথে করে দেখা করার জন্য এসেছিল। এলাকায় ঐ শিল্পী নিজেকে শিল্পী বলে পরিচয় দিতে চান না। কারণ, এলাকায় সম্ভাব্য যে কয়েকটি মেয়ের সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা হয়েছে, তাদের অভিভাবকদের কেউই গান গায় এমন ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবেন না বলেছেন। অথচ এই মেয়েদের যে কোন একটিকে পছন্দ করে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত এই শিল্পী। তমাল কথা বলার এক পর্যায়ে ঐ শিল্পীকে শিল্পী সম্বোধন করায় আড়চোখে ইশারা করে জানিয়ে দিলেন, এলাকার বড় ভাইয়ের সামনে শিল্পী হিসেবে যেন তাকে না বলা হয়। ব্যাপারটি পরে একদিন ঐ শিল্পী খুলে বলেছিলেন তমালের কাছে। ময়মনসিংহ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। ফরমাল অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে সন্ধ্যার একটু আগে। দেশের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পীরা কিছুক্ষণ আগেই গান গেয়ে মাতিয়েছেন ময়মনসিংহ স্টেডিয়ামের পরিপূর্ণ দর্শক-শ্রোতাদের। এবার অন্য রকম গান হবে। ইনহাউজ গান। গান গাওয়ার যন্ত্রাদি, স্পীকার, কন্ট্রোলার সব কিছুই প্রস্তুত করা হয়েছে। একের পর এক গান চলছে। চলছে স্পেশাল পানীয়। তমালের এই অভ্যাসটা কখনোই ছিল না। তাছাড়া বরাবরই এটার বিরুদ্ধে তার অবস্থান শক্ত করে তুলে ধরেছে সবার কাছে। অন্যরা বলতে থাকলো- আরে এটা এ সময় চলে। একটা জোশ থাকতে হবে না। এখন তো আমরা আমরাই। ব্যাপারটা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলো যে তমাল এটা গ্রহণ না করলে যেন সবাইকে অপমান করা হচ্ছে। কি করবে ভেবে পেল না তমাল। বুঝলো, অভিনয় করা ছাড়া এমন অবস্থায় আর কিছু করা নেই। -এই নিচ্ছি বলে, পানীয়ের বোতল ধরেই বাঁ হাতে পেটে হাত দিয়ে কঁকিয়ে উঠলো তমাল। চাপা চিৎকার করে উঠলো। কোঁকাতে কোঁকাতে বলল- গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা হবে হয়তো। আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। কয়েকজন ধরে বাইরে নিয়ে গেল তমালকে। অ্যাম্বুলেন্স কল করে ময়মনসিংহ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলো তমালকে। অ্যাম্বুলেন্সে তমালের সাথে একজন মাত্র সঙ্গী হয়ে গেল। চরপাড়া মোড়ে আসার সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে নেমে গেল তমাল। সঙ্গী লোকটিকে বলল- ভাই, এসবের অভ্যাস নেই আমার। অযথাই জোর করে কেন আমাকে বাধ্য করার চেষ্টা করলেন? আমার কিছু হয়নি। অভিনয় ছিল মাত্র। ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতার টাইটেল গানের কথা মনে পড়ছে- যদি লক্ষ্য থাকে অটুট/বিশ্বাস হৃদয়ে/হবে হবেই দেখা/দেখা হবে বিজয়ে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্ত:নিয়ন্ত্রণ যেমন দরকার তেমনি আন্ত:নিয়ন্ত্রণও দরকার। তবে মাঝে মাঝে কৌশল পাল্টে নিয়ন্ত্রণকে করা যায় আরো সুনিয়ন্ত্রিত। এখন প্রশ্ন হলো আপনি আপনাকে শুদ্ধের পথে ধরে রাখবেন নাকি রাখবেন না। নিশ্চয়ই এই গানের মতো জীবন কেউই চাই না আমরা- নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে/চোখের তারায় রঙ জমেছে/এখন কোন দু:খ নেই/নেই কোন ভাবনা/এমনি করেই দিন যদি যায়, যাক না।

গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। এক পাশে লাউড স্পীকারে গান চলছে। নাচানাচি করছে সবাই। নাচতে নাচতে অবস্থা বেগতিক। একজন রোমানাকে টেনে নিয়ে নাচতে নাচতে বলল- আরে আজ একটু নাচ না। রোমানা- একটু তো নাচলাম। – একটু হলে হবে? একটু পাগল হয়ে নাচ না। একদিন অমন ঝাক্কাস নাচলে কিচ্ছু হবে না। চল। রোমানা- শোন্, বেশি বেশি করিস না। পরে কিন্তু মাথা ঘুরে পড়ে যাবি। অতি মাত্রায় ধুম-ধাড়াক্কা নাচতে নাচতে ধপাস করে পড়ে গেল নাফিসা। নাক মুখ দিয়ে ফেনার মতো বের হতে শুরু করলো। গোঙ্গাতে থাকলো। ভয় পেয়ে গেল সবাই। সব আয়োজন হঠাৎ করেই বন্ধ হলো। পুরো আনন্দের আয়োজনটি মাটি হবার জোগাড় হলো। হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেবার পর ঠিক হলো নাফিসা। ততক্ষণে নাফিসার বড় একটা শিক্ষা হলো যে অনেক আনন্দের মাঝে, অনেক রাগের মাঝে, অনেক সমস্যার মাঝেও উঠে দাঁড়াবার জন্য নিজেকে সামলে রাখতে হয়। মহাজ্ঞানীরা যুগে যুগে তাই করেছেন। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করেছেন। ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন সফলতাকে করায়ত্ত করতে।
আজ স্বপ্ন সাজুক মনে ।
বাজুক সুখের দামামা,।
নিত্য পরিকল্প তোমার ।
হোক দিব্য শুদ্ধনামা।
দিয়ো না করতে বিলিন।
সবটুকু অর্জন হাতে পেলে,।
করো সংযম নিজেরে তবে।
মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে।

লেখক- এস জে রতন।
সঙ্গীত শিল্পী, উন্নয়নকর্মী ও প্রশিক্ষক।
পাতাটি ৩৮০৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা



বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

-এস জে রতন

মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ;
বিশ্বাসে তবে কি মেলাবে তত্ত্ব, সফল হবে কি পড়া এই তাবিজ?
নব্য যারা বুঝবে কি লক্ষ্য, নেয় যদি বাহ্যিক শক্ত পক্ষ?
রবে কালহীন কালান্তরের সভ্যতা, সতত যা পর-মর্তে পবিত্র বক্ষ!
এফএম রেডিও’র ধারণা তখনো কেউ মাথায়ই আনতে পারেনি। ঝন্টু নামের এক স্কুল বন্ধু কথা বলাতে বেশ পারদর্শী ছিল। কত কথা যে কোন মুহূর্তেই সাজিয়ে গুছিয়ে, কোন সময় ক্ষেপণ না করে ঝটপট মজা করতে করতে চালিয়ে যেতে পারতো ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা ছাড়া আর কোন রেডিও’র প্রচার ছিল না। ঘোষক ঘোষিকাগণ কত স্পষ্ট করে শুদ্ধ উচ্চারণে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান ঘোষণা করতেন। এই ঝন্টুর কথা এখন মনে পড়ছে। এখন এফএম রেডিও’র যে দাপট আর আরজেদের যে অবস্থা, তাতে করে ঝন্টুর কথা খুব মনে পড়া স্বাভাবিক। একদিন তমালসহ তার আন্যান্য বন্ধুরা ঝন্টুর চটপটে কৌতুকভরা কথামালায় এমনভাবে বুঁদ হয়ে গেল, যে কখন ক্লাস শুরু হয়ে প্রায় শেষ হতে চলেছিল কেউই বুঝতেই পারেনি। সাপের মতো পেঁচানো কালো ডোরাওয়ালা বেত হাতে শিক্ষক মহোদয় রাগে গজগজ করে, স্কুলের আঙ্গিনায় গাছের ছায়ার নিচে বসে ঝন্টুকে শোনার আড্ডায় হাজির। সময় বেশি নেননি স্যার। ঝপাৎ ঝপাৎ করে তমালদের পাঁচ-ছয়জনের পিঠে প্রচন্ড বেতের বাড়ি। বাড়ির আঘাতে একেকজন বাইম মাছের মতো বাঁকা হয়ে চিৎকার করে উঠছিল। কোন রকমে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখা গেল শিক্ষক মহোদয় দৌড়াচ্ছেন। কোন দিকে? ঝন্টুর পিছু নিয়েছেন উনি। মানে, ঝন্টু মুহূর্তেই টের পেয়ে বাঘের মুখে তার বাকি শ্রোতা-বন্ধুদের রেখে, বেতের বাড়ি থেকে দূরে থাকতে ভোঁ দৌড় দিয়েছে। কত চটপটে আর প্রত্যুৎপন্নমতি ছিল সে! শেষ পর্যন্ত শিক্ষক সাহেব ঝন্টুকে আর ধরতে পারেনি। শিক্ষক রাগে ক্ষোভে চটে গিয়ে বলছিলেন- কালকে আসবি না ক্লাসে? সেদিন দেখাবো। তমালরা ক্লাসে গিয়ে কান ধরে নীল ডাউন হয়ে থাকলো। মনে মনে ভাবতে থাকলো কত বোকা তারা। ঝন্টু তো তাদেরই বন্ধু, একই বয়েসি, অথচ কতো বুদ্ধি তার! সে-ই আমাদের চটকদার গল্প শুনিয়ে ক্লাস মিস করালো আবার স্যারের বেতের বাড়ি থেকেও নিজেকে নিরাপদে রাখলো।

ঝন্টু পরেরদিন ক্লাসে ঠিকই আসলো। সেদিন তাকে পড়ায় খুব মনোযোগী মনে হলো। সেই শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন। হাতে যথারীতি সাপের মতো পেঁচানো কালো দাগওয়ালা বেত। ভয়ে ঝন্টু ছাড়া অন্যান্যদের গা শিউরে উঠছিল। কি জানি কতো মার মারবে আজ ঝন্টুকে! ঝন্টুর দিকে বন্ধুদের কেউ কেউ তাকিয়ে ভয়ে কেঁদেও ফেললো। কিন্তু ঝন্টু নির্বিকার। যেন কিছুই সে জানে না। স্যার জিজ্ঞেস করলেন- ঝন্টু, কাল কি অপরাধ করেছো তুমি জানো? ঝন্টুর কোন উত্তর নেই। স্বাভাবিক। ঝন্টু, আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ না? স্যার বেত নিয়ে অগ্নিমূর্তি হয়ে ঝন্টুর কাছে এসে চড়াও হওয়া মাত্র বেঞ্চ থেকে ধপাস করে পড়ে গেল ঝন্টু। কাঁপতে থাকল। মৃগীরুগীর মতো। স্যার প্রায় বেআক্কেল হয়ে গেলেন। কি ব্যাপার না মারতেই এমন হলো? সবার চোখ চড়কগাছ। শিক্ষক- বিষয়টার সাথে উনি যুক্ত নন, এমন একটা ভাব করে বেতটা ক্লাসের এক কোনায় লুকিয়ে রেখে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। একটু পর ঝন্টু নিজে নিজেই ঠিক হয়ে গেল। এরপর অন্য ক্লাসগুলো ঠিকভাবেই সম্পন্ন করল ঝন্টু। এই বিষয় নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি করতে গেলে আবার কি থেকে কি হয়, তাই ঐ শিক্ষক আর এ ব্যাপারে সারাদিন কোন উচ্চবাচ্য করেননি। ক্লাস শেষে একসাথে বাড়ি ফেরার পথে ঝন্টু হাসতে হাসতে কথার ফুলঝুরিতে বন্ধুদের সাথে বলছিল- দেখলি তো কেমন করে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হয়? ঝন্টুর চটকদার কথামালায় ক্লাস মিস করিয়ে দেয়া, কথার মারপ্যাঁচে কারো পেন্সিল নেয়া, খাতার পাতা ছিঁড়ে নেয়া, পরীক্ষার হলে উঁকি দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেখা আবার যে দেখালো তাকেই বেতের মার খাওয়ানো, এই রকম বহু ঘটনার ওস্তাদ এই ঝন্টু। এটা একটা সিম্বলিক প্যাসেজ। সমাজেও এই ধরনের লোক বসবাস করছে। যাদের লক্ষ্যই যেন অন্যের সরল বিশ্বাসকে পূঁজি করে বোকা বানিয়ে ঠকিয়ে নিজে জিতে যাওয়া। কিন্তু এটা কি সত্যিই জিৎ?
ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই?
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।
চোখ দু’টো তোর ডাগর ডাগর যেন গেঁয়ো ভূত,
এতো আলো কোথায় পাস, তুই কি স্বর্গের দূত?
লক্ষ্মী ছেলে আয় না কাছে কোলে তুলে লই,
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।

এই গানের কথাগুলো প্রায়ই মনে পড়ে, যখন ট্রেনে করে গ্রামের বাড়ি যায় তমাল। মনে পড়ে কিছু স্মৃতিও। একবার ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা দিতে দশ বার জন বন্ধু মিলে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। জার্নি বাই ট্রেন। এখনকার মতো ট্রেনে তখন যাত্রীদের অতো হুড়োহুড়ি ধাক্কাধাক্কি ছিল না। সীটের পর সীট ফাঁকা পড়ে থাকতো। রাতের ট্রেন, সারারাত ভ্রমণের পর সিলেট পৌঁছাতে হবে। একবন্ধু বলে উঠলো- দোস্ত, দিনে গেলে কি হতো? রাত্রে কি ট্রেনে কোন হুর-পরী থাকে? জার্নিতে পাশের সীটে বা চোখাচোখি সীটে দু’একজন চোখ ধাঁধাঁনো রাজকন্যা না থাকলে জমেই না। কেমন একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার থাকে। একেক বন্ধুর একেক বাতিক যেন, কেউ হয়তো কালকের ভর্তি পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন আসতে পারে, তা নিয়ে ভাবনা আবার কারো বা তর্ক বা গল্প বা রাজনীতি নিয়ে বাতচিৎ। একটু প্রেম পিয়াসী টাইপের বন্ধুটি অস্থির যেন বেশি। খুব বেশি সময় ধরে সীটে বসে থাকতে পারে না। এই আসছি, পা-দু’টো ধরে আসছে, একটু হেঁটে আসি বলে কোথায় যে যায়? আবার হঠাৎ কোত্থেকে যেন উড়ে এসে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প জমায়। দোস্ত, পরের কম্পার্টমেন্টে একটা পরী আছে। চল্ কথা বলার চেষ্টা করি। জার্নিটা মধুর লাগবে। সম্ভবত সে-ও ভর্তি পরীক্ষা দিতেই যাচ্ছে। রাকিব এই বন্ধুর সাথে উঠে চলে গেল পরের কম্পার্টমেন্টে। বাইরে চাঁদের আলো। পূর্ণিমার চাঁদ হবে সম্ভবত। কম্পার্টমেন্টের ভেতরে নন-এনার্জি বাল্বের সয়াবিন তেল রঙের আলো। কপোলের একপাশে চাঁদের রূপালী আলো আরেক পাশে বাল্বের আলোর প্রক্ষেপণ। হাল্কা বাঁকা হয়ে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ। জানালা খোলা। ঝিরঝির পবন বইছে। প্রেম পিয়াসী বন্ধুটি কবিতার পাশাপাশি মাঝে মাঝে ছবিও আঁকে। তার এই বর্ণনা স্বাভাবিক প্রেমিক মনের। সামনের দু’টি সীটই ফাঁকা। ইচ্ছের সাথে কপালের প্রেম যাকে বলে! দুই বন্ধু বসে পড়ল। ভাবখানা এমন যে ওদের নিজেদের টিকেটের সীটেই বসলো ওরা। মেয়েটি সুন্দরী মায়াবী তবে একটা গম্ভীর ভাবও আছে চোখে মুখে। পাশে তার গার্ডিয়ান মনে হলো। তবে উনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বার বার মেয়েটির কাঁধে ঝুঁকে পড়ছিলেন। মেয়েটি কখনো আলতো পরশে তাঁর মাথাটিকে কাঁধে জায়গা দিচ্ছিল আবার কখনো যতœ করে সোজা করে দিচ্ছিল। মজা করে অস্ফূট স্বরে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কানে কানে বলল- পিরিতের কলসী হলে হায় গো/আদরে কাঙ্খে নিতাম/ভালবাসার জল ভরিয়া/আদরে ধরে রাখিতাম।
মেয়েটির সাথে কয়েকবার চোখাচোখি হলো রাজনের। মায়াবী চোখ। মনে হলো কিছু বলা যায়। -সিলেটে যাচ্ছেন? আমাদের ভর্তি পরীক্ষা, আপনার…? -জি, হ্যাঁ আমারও একটা পরীক্ষা আছে। -কি পরীক্ষা? -চাকরীর। -পড়াশোনা? -আমি এই বছরেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছি। আমার হাজব্যান্ড সিলেট মেডিকেলের অধ্যাপক, আমিও সেখানেই জয়েন করার চেষ্টা করছি। পাশের লোকটিকে দেখিয়ে -আমার হাজব্যান্ড গতরাতে জার্নি করে আমাকে সাথে নিয়ে যাবার জন্য ঢাকায় এসেছিল, তাই বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে বেশ ঘুমুচ্ছে সে। রাজন- দোস্ত আমি একটু আসছি। -আরে কোথায় যাচ্ছিস? চল আমিও যাচ্ছি। -আরে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? বলে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকালো মেয়েটি। এই দুই বন্ধু সেই আগের সীটে এসে বসল। অন্যবন্ধুরা জিজ্ঞেস করল- কি রে পরী কি উড়াল দিল। নাকি ছ্যাঁকা দিল? রাজন- আর বলিস না, কে জানে অমন কিউট আর কচি একটা মেয়ে বুড়ো ডাক্তারকে বিয়ে করেছে! আর মুখটাকে অতো অল্পবয়েসি করে না রাখলেই বা কি দোষ হয় মেয়েদের। আমাদের বাড়া ভাতে লাল ব্রিটিশদের দখলদারী আর কি! দুই বন্ধুর ধারণা থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাস ভেঙ্গে খানখান হলো প্রেমের অনুভূতির। মেয়েটির অবয়বেও এমন কিছু ছিল যা সাধারণকে বোকা করে দিতে পারে। সমাজে এমন উদাহরণও বেশ। তাই অন্যকে মূল্যায়ন করার পূর্বে আরো ভাবার, বিশ্লেষণ করার ব্যাপারগুলোকে নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের ভাবিত বিশ্বাস যেন যথাযথের কাছিকাছি হয়, না হলে, বিশ্বাস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে একসময় আত্মবিশ্বাসও ভেঙ্গে যেতে পারে। হঠাৎ মাঝরাতে ট্রেনের টিটির উদয়। একটা টিকেট কম আছে। রাজন বলল- ভাবিস না, টিকেট করতে হবে না। আমি দেখ কি করি? তমাল অনুরোধ করল- আরে আমরা টিটির কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে টিকেট কেটে নেব। তুই কোন ওস্তাদি করার চেষ্টা করবি না। রাজন- দেখ, এটা আমারটাই মিস্। আমি দেখছি কি করা যায়, বলে চলে গেল। অন্য আরেকটা সীটে গিয়ে বসলো রাজন। টিটি টিকেট চাইলে বলল- আমরা তের জন বন্ধু একসাথে ভর্তি পরীক্ষা দিতে সিলেটে যাচ্ছি। এগারজনের টিকেট পেছনে বাম পাশে বসা বন্ধুদের কাছে আছে, আর দুইজনের সীট সামনের বগিতে পড়েছে। ওখানে আমি আর আমার এক মেয়ে বান্ধবি বসেছি। তার কাছে আপনি দু’টো টিকেট পাবেন। টিটি পরবর্তী যাত্রীদের টিকেট দেখার জন্য সামনে চলে গেল। রাজন উঠে যেয়ে টিটিকে পেছনে ফেলে সেই মেয়েটির কাছে গেল। বলল- ভাইয়া এখনো ঘুমুচ্ছে? একটু চোখে মুখে পানি দিলে ঘুমটা ভাঙ্গতো আর ফ্রেশ লাগতো। আমরা তো প্রায় এসেই পড়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তো নামতে হবে। হঠাৎ এমন কথায় মেয়েটি বেশ বিশ্বাস করলো যে ট্রেন হয়তো সিলেটের কাছাকাছিই চলে এসেছে। তাই বলল- ট্রেনের ওয়াশরুমগুলো সুবিধার কি না? -না না, অসুবিধা হবে না। এই দেখেন সামনের ওয়াশরুমটা বেশ পরিষ্কার। আমি ব্যবহার করলাম মাত্র। মেয়েটি তার হাজব্যান্ডকে ডেকে ওয়াশরুমে যাবার জন্য বলতেই টিটি এই কম্পার্টমেন্টে ঢুকে গেল। রাজন লোকটিকে ইশারায় ওয়াশরুম দেখিয়ে দিয়ে বন্ধুদের কাছে চলে এলো। টিটি এসে মেয়েটির কাছে টিকেট চাইলে দু’টো টিকেট বের করে দিল। মেয়েটির বয়স আর অবয়ব দেখে টিটির কাছে রাজনদের বন্ধুদের মতোই মনে হলো। তাই এগার আর দুই এই মিলে তেরজনের টিকেটের হিসেব সে মেলালো। কিছু সাধারণ বিশ্বাস যা মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে তা থেকে বের হবার একটাই উপায়, তা হচ্ছে গানের মতো করে বলতে হয়- মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন/মানুষ ধরো মানুষ ভজ/শোন বলিরে পাগল মন। যে বিশ্বাস দিয়ে নিজে ভুল করেছে সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অন্য ধাঁধাঁয় ফেলে নিজের অপরাধ আরো বাড়িয়েছে রাজন। মানুষের এই সরল বিশ্বাসগুলোকে আমরাই কেন অপপূঁজি করে, বোকা বানিয়ে মানুষকে ছোট করছি?
আমি তো দিব্য সরল, অমলিন চক্ষে দিব্য সকাল
করো না নষ্ট সব, ভেঙ্গো না ভাবনা হতে পরিপুষ্ট, বলো না মাকাল।
এ চোখে একটাই ছবি, যা অলোকময় পরিষ্কার,
বিভেদে, ধাঁধাঁয়, অস্পষ্টতায় ফেলবে না তোমায় বার বার!

একই অঙ্গে কত রূপ! নিশি তমালের এক গানের ছাত্রী, সাংস্কৃতিক বা অ্যাকাডেমিক এমন কোন অনুষ্ঠান বা কার্যক্রম নেই যেখানে তাকে দেখা যায় না। নিঃসন্দেহে এটা চমৎকার। মাল্টিটেলেন্টেড এরা। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো যখন চরিত্রে স্থায়ীভাবে বসে যায়, বা বিভিন্ন অঙ্গের এই বহুরূপী রঙ যখন আর শুধুমাত্র বাহ্যিক চরিত্রে না থেকে অভ্যন্তরটাকে পরবির্তিত করে তখন সমস্যাটা প্রকট হয়। যত রকমের মাল্টিটেলেন্টেডই হোন না কেন প্রতিটি মানুষেরই কিছু মৌলিক বিষয়ে একদম একমতেই থাকতে হবে। যা সার্বজনীন, শুদ্ধ। এর কোন বিকল্প কখনো সুস্থ, বিবেকবান মানুষের থাকবে না। বান্ধবি তপাও তেমনি টেলেন্টেটেড ছিল। ভেতরকার ভিতটা মনে হয় শক্ত ছিল না, তাই অল্প বয়সেই প্রেম, প্রত্যাখ্যান, বিচ্ছেদ-বিরহ, আবার স্বপ্ন দেখা আবার ভেঙ্গে পড়া। অবশেষে অনুধাবন, ততদিনে সবশেষ। সম্ভাবনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে অস্থির সময়ের স্রোতে নিঃশেষ হলো।

এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল তমালের সাথে থাকা একবন্ধু। পরিচয় পর্ব ও কথার পর বন্ধুটি জানালো খুব সিরিয়াস লোক এই বড় ভাই। মানুষ খুন করে হাসপাতালে যেয়ে সেই খুনীর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে নিজের সহমর্মিতা জানাতে অভিনয়ের জুড়ি নেই তার। এতো সূক্ষ্মভাবে সবকিছু ম্যানেজ করেন যে, কেউ তাকে কোনভাবেই কালপ্রিট প্রমাণ করতে পারবে না। কি নারী কেলেঙ্কারী, কি টেন্ডারবাজী, কি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবসা, কি চোরাকারবারী, কি পেশী শক্তির অপব্যবহার, কি সিন্ডিকেট করা, এমন কোন কাজ নেই যেখানে তার চলাচল নেই। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখলে সুদর্শন, সুপুরুষ, সুকত্থ, সুকণ্ঠ, সুআলোচক, যৌক্তিক, মার্জিত মনে হবে। বেশ কিছুদিন তার সাথে তমালের যোগাযোগ ঘটে। তার চোখ দু’টো আর আচরণ কখনো এমন অবিশ্বাস দেখাতে পারেনি। তমালের কাছে মনে হয়েছে বন্ধুর কথা বুঝি মিথ্যে। রাজনীতি, সংগঠন আর ব্যবসার খাতিরে এই বড় ভাইয়ের সাথে সময়গুলো চলছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আসল রূপ প্রকাশ পেল তখন, যখন তার বলয়ের লোকদের স্বার্থ একটু স্খলিত হলো। বড়ভাইয়ের সাথে থাকা এই লোকেদের স্বার্থ এবং তার স্বার্থ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকলো তার কুৎসিত আচরণ। অতো সুন্দর একটি মানুষের মধ্যে এমন আচরণ বা কর্মকান্ড লুকিয়ে আছে যা ভাবাই যায় না।

একজন মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে তার আচরণ, বাহ্যিক কাজ-কর্ম দেখে তখন বিশ্বাসী মানুষটির দায়িত্ব বেড়ে যায়। অনেক অপরাধ ভেতরে লুকানো থাকলেও, এই বিশ্বাসী হয়ে ওঠার কারণেই অবিশ্বাসগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে। মানুষ হয়ে ওঠার জন্য, বিশ্বাসী হয়ে ওঠার জন্য আমাদের প্রতিযোগিতা করা উচিৎ। অবিশ্বাসী হবার ঘৃণিত রূপ এমন- যে মানুষটি বিশ্বাস করে আপনাকে বিশ্বাসী মনে করলো, সেই মানুষটির বিশ্বাসের মূল্য দেবার যোগ্যতাই আপনার নেই। আমাদের সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, লেখক, কবি, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি আরো কতশত নামীদামী পেশাদারী লোক আছেন, দরকার এর পাশাপাশি একেকজন ভাল মানুষের, সৎ মানুষের, বিশ্বাসী মানুষের। শত আদর, যতœ, সেবা আর ভালবাসা দিলেও যে কোন মুহূর্তে পশু যেমন তার পাশবিক আচরণ প্রকাশ করতে পারে মুনিবের প্রতি, হয়ে উঠতে পারে স্ববৈশিষ্ট্যে পশু, ঠিক তেমনি একজন অন্যায়কারী, অসৎ মানুষ সমাজের জন্য, বিশ্বের জন্য ভয়ংকর।

মনের গহীনে আজি স্বপ্ন আঁকি, তুলিতে আঁকবো স্বপ্ন বিশ্ব;
যা আছে নিজের ভাল, বিলাব সব, হবো দাতা, তুলে ধরবো রিক্তেরে, নিজে হবো নিঃস্ব!
আপন আলোয় আলোকিত হবে ধরা;
জরা, পঁচা, অস্পৃশ্য হবে জড়, ভংগুর, মরা!
সুচিন্তার এ আলো ছড়াবেই একদিন, হবে স্বর্গ এ মর্ত;
থাকবে না পাপ, সুলব্ধ হবে বেহেশ্ত, লাগবে না কোন শর্ত!

-এস জে রতন
সংগীতশিল্পী, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকমী
sjratan@gmail.com
পাতাটি ৩৪৭৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন



– এস জে রতন

ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো
কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো।

হ্যালো, কথা বুঝতে পারছি না ভাল
একটু জায়গা চেঞ্জ করো, হেলো না হয় দোলো।

তবে নেটওয়ার্ক পাবে ভালো, স্পষ্ট হবে কথা
ওহ্! লাইনটাই কেটে গেলো, লাগলো মনে ব্যথা!

২০০১ সালের কথা। শখ করে টিউশনীর টাকা জমিয়ে একটা গ্রামীণফোন সিমসহ নকিয়া সেট কিনল তমাল। তমালের বাবা ছেলের এমন ভাবে সঞ্চয় করে কোনকিছু কেনার বিষয়ে বেশ খুশি হল। অন্তত ঘরের জমানো টাকা ব্যবহার না করে নিজের যোগ্যতায় কিছু করাটা বেশ ভাল চোখে দেখলো। তমাল তার এই মনের বাসনার কথা মোবাইল কেনার আগে কখনো কাউকে জানায়নি। তবে খুব ইচ্ছে ছিল কি করে একটা মোবাইল কেনা যায়। বাবা স্বউদ্যোগী হয়ে মোবাইলের জন্য দামী একটা মোবাইল কাভার কিনে দিলেন। বললেন- তোর কাজে খুশি হয়ে এটা আমার টাকা থেকে তোকে কিনে দিলাম। পরিবারের সবার মধ্যে এই একটাই মোবাইল ফোন তখন। পরিবারের লোকজন তো বটেই, পাড়া পড়শি অন্যান্যরাও তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য এই তমালের সেল নাম্বারই দিতে শুরু করল। কতজন কত রকমের কথা বলার জন্য কতজনকে যে চায়, তা আর বলার অপেক্ষাই যেন রাখে না। এমন কিছু কলও আসতো যার জন্য মধ্যরাতে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে, এক কিলোমিটার হেঁটে চিৎকার করে ডেকে তারপর কথা বলার জন্য মোবাইল এগিয়ে দিতে হত। তমালের কল খুব কমই আসতো। কারণ তখন তমাল সবেমাত্র পড়া শেষ করে নতুন একটি চাকরিতে যোগদান করেছে। গ্রামে থাকলে ঘরের বাইরের আঙ্গিনায় যেখানে খোলা মাঠের সবুজ দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে যায় সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। ঘরের মধ্যে নেটওয়ার্ক কখনো পাওয়া যেত কখনো পাওয়া যেত না। তবে রাত্রে নেটওয়ার্ক থাকত। মোবাইল স্ক্রীনে ভেসে থাকা নেটওয়ার্কের পাঁচটি বারের মধ্যে এক আর দুইয়ের মধ্যে থাকত। দুর্বল নেটওয়ার্ক। তবে কথা বলা যেত। কখনো কখনো এমন হত সারাদিনে বাড়ির খোলা আঙ্গিনার কাছে গেলেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না বা ধরা যেত না। তখন বাড়ির সামনের পুকুরের কাছে গেলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। পানির সাথে নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়। পানির অপর নাম জীবন। ঠিক তেমনি জীবনের সাথেও নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে। জীবন থাকলেই নেটওয়ার্ক থাকে আর জীবন নেই তো নেটওয়ার্ক নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক কবি ভদ্রলোক তার জরুরী এক দরকারে তমালের নানার সাথে দেখা করার জন্য অনেক পথ মাড়িয়ে, ভ্রমণে অনেক কষ্ট সহ্য করে জামালপুরে এসে কবি বন্ধুর বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। নানা কবির সাথে এই কবি ভদ্রলোকের কোন একসময় বেশ বন্ধুত্ব ছিল। সে অনেক বছর আগের কথা। দুই বন্ধু তখন একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কালের পরিক্রমায় যোগাযোগটা এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের প্রায় শেষ সময়ে এসে এই কবি ভদ্রলোকটির মনে পড়ে যায় তমালের নানার কথা। সে সময়ে হাতে গোনা কিছু পত্রিকা আর মিডিয়া ছিল। যে কারণে কোনভাবে যোগাযোগ আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। একে অপরের কিছু কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপি এই দুই বন্ধুর কাছেই ছিল। বিশেষ প্রয়োজনেই এগুলো এখন বাংলাদেশ সরকারের এক ট্রাস্টিতে সংরক্ষণ করতে চাইছেন এই কবি ভদ্রলোক। যেগুলো নাকি যুগের পর যুগ আর্কাইভে থাকবে আর নতুন নতুন কবিরা এই লেখাগুলো নিয়ে গবেষণা করবে। যখন জানানো হল উনি আর বেঁচে নেই, তখন প্রায় অজ্ঞান হবার মত অবস্থা হলো অতিথি কবির। কাঁদতে কাঁদতে বললেন- উনার কাছে কবিতা সাহিত্যের অনেক মূল্যবান সম্পদ ছিল, যা শুনে বা জেনে লিখে রাখা যেত। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আউট অব নেটওয়ার্ক হলে যা হয় তাই হল। যদি এই দুই বন্ধুর মাঝে কোন না কোনভাবে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হত তাহলে হয়তো এমনটা হত না। ভদ্রলোক এই বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই তার পরিচিত আরো কিছু কবি বন্ধুর নাম ও ঠিকানা মনে করে তালিকা করে লেখার চেষ্টা করল, যাতে এই ধরনের ভুল আর না হয়। আমরা মানুষ, এমন ধরনের যে যখন আমাদের কাছে রতœ মাণিক্য থাকে তখন তার গুরুত্ব অনুধাবন করি না। আবার যখন কাছে না থাকে বা কোনভাবেই আর তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না, তখন ব্যতি-ব্যস্ত হই, আফসোস করি আহা কি হারিয়েছি! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবদ্দশায় দুঃখ করে বলেছিলেন- বাংলা সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে আমি কি দিয়েছি জানি না, তবে আমার গানে আমি যা দিয়েছি তা আমার মৃত্যুর পর মানুষ উপলব্ধি করবে।

একটু খানি ছিল তোমার পূঁজি
তাতেই একটু আমার প্রেম বুঝি;

একটু ভাললাগা বাড়লো বড়
তবে নেটওয়ার্কটা তুমিই শক্ত করো;

এভাবেই শুরু, আর শেষটা যেন না হয়
তোমার আমার এই নেটওয়ার্কটা আজীবন যেন রয়।

স্কুল জীবন থেকে ভাললাগা। নরম স্বভাবের নীলিমা মেধাবী বাদলের সবকিছুতেই যেন আকর্ষণ অনুভব করে। পড়া সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে প্রায়ই সাহায্য নিত নীলিমা। পাশের গ্রামে এক চয়োরম্যানের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করত বাদল। বাদলদের বাড়ি খুলনায়। ময়মনসিংহে এসে নীলিমাদের স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। নবম শ্রেণীতে প্রথম হয়েই সবার নজরে আসে বাদল। স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, পাড়া-পড়শি, বন্ধু-বান্ধবি সবাই খুব আদর, স্নেহ আর সমীহ করে। স্কুল থেকে ফেরার সময় একসাথে হেঁটে বাড়ি যেত নীলিমা বাদলসহ চার পাঁচজন বন্ধু। একদিন নীলিমা হঠাৎ মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যায়। অন্য বন্ধুরা নীলিমার বাবাকে খবর দেবে বলে চলে গেলে বাদল সেখানেই নীলিমার পাশে ছিল। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে বন্ধুদের কেউ বা নীলিমার বাবা বা কোন আত্মীয়-স্বজন যখন এগিয়ে আসতে দেখা গেল না, তখন বাদল নীলিমাকে দুইহাতে ধরে তুলে নিয়ে ঘাসে শুইয়ে দেয়। নীলিমা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকে। মেঠো পথ, কাছে কোলে কোন বাড়ি না থাকায় নীলিমাকে জাগিয়ে ধীরে ধীরে কাছের এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে বাদল। কিন্তু নীলিমাকে তো জাগিয়ে তুলতে হবে। পাশের এক নিচু জলাশয় থেকে হাতের পাঞ্জায় করে পানি এনে নীলিমার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দেয়। নীলিমা জেগে উঠলে বাদলের কাঁধে ভর দিয়ে নীলিমাকে পাশের এক বাড়িতে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই বাদলের প্রতি টান অনুভব করতে থাকে নীলিমা। শুচি শুদ্ধ এক পবিত্র প্রেমের উপক্রমণিকা যেন। প্রয়োজন আর লেখাপড়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের কারণে যোগাযোগে কিছুটা হলেও ছেদ পড়ে নীলিমা আর বাদলের মধ্যে। ভিন্ন কলেজে ভর্তি হওয়া, ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, জীবন নিয়ে ভাবা, চাকরীর সন্ধান, বিভিন্ন বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে। অনেকগুলো সময় পেরিয়ে যায়। মোবাইলে কথা হত সবসময়। হঠাৎ বাদলের মোবাইল বন্ধ। নীলিমা খুলনায় বাদলের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেবার প্রয়োজন কখনো অনুভব করেনি। কারণ মোবাইলেই সবসময় কথা হত। আর সম্পর্কটা চলছিল অনেক ভদ্রোচিতভাবে, তাই হয়তো অতোটা খোলামেলা হয়ে সবকিছু জেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় নয় বছরের সম্পর্ক হঠাৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হবার কারণে শেষ হয়ে যাবে, এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল নীলিমার। নীলিমা ভাবছিল- আমি না হয় তার বাড়ি চিনিনা কিন্তু চাইলে সে তো ময়মনসিংহে আসতে পারে। আমার বাড়ি, ঠিকানা সবকিছু চেনে সে। কোন কারণও খুঁজে পাচ্ছেনা। কেন হঠাৎ এমন হবে? বাদলের তো নীলিমার নাম্বার জানাই আছে, তাহলে যে কোন ভাবে কথা বলা সম্ভব। এমন তো হবার কথা না? কিন্তু এমন হল। এতো আলাপ হতো তাদের দু’জনের মাঝে, কত গুরুত্বহীন কথায় দিনের পর দিন, সময়ের পর সময় পার করেছে এই দু’জনে। অথচ কত কিছুই না অজানা থেকেছে? সারা জীবনে মানুষ এভাবেই বোধ হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সময় পার করে। মনের সাথে অনেক বোঝা পড়া করে একসময় খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় নীলিমা। বাদলের সাথে কথা বলার সময়, খুলনায় তাদের বাড়ি, স্কুল সেখানকার আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন বিষয় জানিয়েছিল, সেই কথাগুলো মনে করে, অনেক কষ্টে নীলিমা ঠিকই বাদলের বাড়ি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সড়ক পথে দুর্ঘটনায় বাদল মারা যাবার সময় কেউ নীলিমাকে এই খবর জানাতে পারেনি। বাদলের নাম্বারও সেসময় থেকেই বন্ধ। বাদল এখন আউট অব নেটওয়ার্ক। কোন নেটওয়ার্কেই তাকে আর ধরা যাবে না। এখন নীলিমার সংসার আছে। সন্তান আছে। স্বামী সন্তানকে সারাক্ষণ নজরে নজরে রাখে। এদের প্রতিটি কথা আর মুহূর্তকে গুরুত্ব দেয়।

চাকরির প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ করাতে পার্বত্য এলাকায় গিয়েছেন তমাল। রাঙ্গামাটির এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ চলছে। বছর দশেক আগের কথা। এই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই সমস্যা করত। নেটওয়ার্ক পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। ঘুরতে ঘুরতে কোন স্থানে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলেও বেলা বাড়া বা কমার সাথে সাথে নেটওয়ার্কের সবলতা দুর্বলতার পার্থক্য ঘটত। সন্ধ্যা বা গভীর রাত বা খুব ভোরে নেটওয়ার্ক কিছুটা পাওয়া যেত। তমাল ঢাকার সাথে, পরিবারের সাথে ঐ সময়গুলো খেয়াল রেখেই কথা বলত। প্রশিক্ষণ সময়ের শেষে একদিন বিকেলে অংশগ্রহণকারী এবং তমাল মিলে কর্ণফুলী নদীতে ঘোরা এবং সুবলং ঝর্ণা দেখবে বলে নৌকা ভাড়া করল। সাধারণত যেটা হয়, যেকোন জমায়েতেই দেখা যায় প্রায়ই জমায়েত দু’টো ভাগে ভাগ হয়। একটি হচ্ছে মোটামুটি তরুণ বা কম বয়েসীদের দল অন্যটি হচ্ছে এই বয়সের চেয়ে একটু বেশি বয়সের কিছুজনের আরেকটি দল। নৌকা চলতে চলতে একটি ঘাটে থামাল। কেমন করে যেন ঘুরতে ঘুরতেই দু’টো দলে ভাগ হয়ে গেল পুরো মূলদলটি। দু’টো মেয়ে অংশগ্রহণকারী তারাও ঐ তুলনামূলক তরুণের দলেই দলভুক্ত হলো। প্রশিক্ষকসহ চব্বিশ জনের মধ্যে চৌদ্দজন তমালদের সাথে বাকি দশজন লাপাত্তা। এই তো এখানেই ছিল, সবার একসাথেই তো থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাকিরা কোথায় গেল? -এক অংশগ্রহণকারী বলছিলেন। একজন তো মজা করে বলেই ফেললেন- ভাই আমাদের দলের ট্রেইনার স্যারও তো তরুণ, তাকে বয়ষ্কদের দলে দিয়ে বাকিরা কিভাবে দল গঠন করল? এ ভারি অন্যায়, কালকের ক্লাসে এটা নিয়ে ঐ গ্র“পের জরিমানা ধরা হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসলো প্রায়। এর মধ্যে ঐ দলের কারো সাথে কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পুত পুত শব্দ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। যার যার কাছেই মোবাইল ছিল, হাতে নিয়ে দেখা গেল মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। একজন বলে উঠলেন- ঐ দলে তো রাঙ্গামাটির স্থানীয় কেউ নেই। সন্ধ্যার পর এখানে অপরাধের মেলা বসে, কিছু একটা হয়ে গেলে কি অবস্থা হবে তাদের? তমালের খুব দুশ্চিন্তা হল। সর্বোপরি সে এই পুরো দলের লিডার, প্রশিক্ষক। যদি সে তাদের সাথে না থাকত বা এই ঘোরাফেরার অনুমোদন না দিত তবে হয়ত দায় থেকে মুক্ত থাকা যৌক্তিক হত। তিন্তু এখন তো সে উপায় নেই। এই তাগড়া তাগড়া যুবক আর মধ্যবয়ষ্ক লোকগুলোকে নিয়ে তার এমন বিপদে পড়তে হবে ভাবতেই যেন পারছিল না।

এদিকে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে, অন্ধকার জেঁকে বসছে। সন্ধ্যা হওয়ায় মোবাইলের স্ক্রীনে নেটওয়ার্ক বার এক-দুই করে আপ-ডাউন করতে দেখা গেল। তমাল বলল- আপনাদের কারো কাছে ঐ দলের কারো নাম্বার আছে? তমালদের দলের একজনকে পাওয়া গেল যে ঐ দলের কোন একজনের সাথে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একই কক্ষে থাকে। তার কাছে তার রুমমেটের মোবাইল নম্বর আছে কি না জানতে চাওয়া হলে বলল- একসাথে থাকতে গিয়ে অনেক কথাই তো হয়েছে এই এগার দিনে কিন্তু কেন যেন মোবাইল নম্বরটা নেয়া হয়নি, ভেবেছি শেষ দিনে নেব। তমালের প্রায় রাগই হচ্ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে বললেন- হ্যাঁ শেষ দিনেই তো নেবেন! শেষ দিনে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে, ভাই আমার বাসের সময় হয়ে গেছে, বেরোচ্ছি, পরে দেখা হলে মোবাইল নম্বরটা নিতে পারবো, পরে যেকোন ট্রেনিং-এ আবার দেখা হবে, তখন বিস্তারিত আলাপ হবে। বার দিনেই আসল তথ্যগুলো শেয়ারিং-এর সুযোগ হল না, আবার কি না কোন অনিশ্চিত কালে দেখা হলে তখন মোবাইল, ঠিকানা ইত্যাদি নেয়া হবে। এটাই করি আমরা। যখন আউট অব নেটওয়ার্ক হই, তখই গুরুত্ব বুঝতে পারি কি ভুলটা হলো। এবার ঐ দলের একজনের নাম্বার এখানকার একজনের কাছে থাকায় সে কল দেবার চেষ্টা করে কিন্তু এখানে নেটওয়ার্ক থাকলেও ঐ অংশগ্রহণকারী হয়তো আউট অব নেটওয়ার্ক তাই বেরসিক নারী কণ্ঠ বলে উঠল- এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কল করে আরো কিছু অংশগ্রহণকারীর মোবাইল নাম্বার নিয়ে কল করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল, কারণ ঐ দলটি যেখানে আছে সেখানে হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা দশজনকে ছাড়াই দ্রুত কর্ণফুলী নদীর জল চিরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হল তমালরা। এবার অপেক্ষা করা কখন আল্লাহ্র দয়া হয় আর বাকি চৌদ্দজন কেন্দ্রে আসেন। রাত বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে সবাইকে অক্ষত পাওয়া গিয়েছিল বটে। তবে শিক্ষা হয়েছিল প্রচন্ড যে আলোচনা, পরিকল্পনা, শেয়ারিং, যোগাযোগ আর নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকার মধ্যে গুরুত্ব কত।

নষ্ট তুমি হয়েছ বেশ, এবার একটু থামো
গভীর জলের ঢেউ দেখেছ, এবার একটু নামো;

সাঁতার জেনে উঠলে কূলে, ভাবলে বেঁচে গেলে
কুমির তো জলেই আছে, ডাঙ্গার বাঘ দেখে ভয় পেলে?

সময়টাকে বেশ বোঝো তো, বানাও টাকা কড়ি
নিঃস্ব হওয়ার ক্ষণগুলো তো অপেক্ষায় পেতে আড়ি।

প্রতিটি উদ্ভাবনের বা আবিষ্কারেরই ভাল দিক আছে। আবার চাইলে এই ভাল দিকগুলোকে মন্দভাবেও ব্যবহার করা যায়। নেটওয়ার্কের মধ্যে থেকে এর ভাল ব্যবহারই সবার কাম্য। কিন্তু সবাই যদি অতো ভালই হতো তবে তো স্বর্গ এই বিশ্বই হতো। বাবার তিন তিনটা ছেলের মধ্যে এই ছেলেটি বেশ দুষ্ট। এখন তো আবার দুষ্ট বলতে মিষ্টি বোঝানো হয়। আসলে দুষ্ট বলতে খারাপ, নষ্ট। ছেলের নেটওয়াকিং ক্ষমতা যথেষ্ট চরম। কিন্তু ছেলে সম্পর্কে বাবার নেটওয়াকিং ছিল যথেষ্ট নরম। তাই ছেলে হাইস্কুল পার হতে না হতেই বড়দের সবকাজে অভ্যস্ত। অকালপক্ক যাকে বলে। আঠার বছর আগে প্রায় সবগুলো পত্রিকায় একটি খবর রেবিয়েছিল, আমেরিকার এক বার বয়েসী ছেলে শিশু কোন এক নামকরা কোম্পানীর সিইও হয়েছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা আর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা করার ক্ষমতা এত প্রখর ছিল যে স্কুলের শিক্ষকম-লী আর বোর্ড তাকে স্বপ্নদিনেই একের পর এক সার্টিফিকেট দিয়ে তার সমস্ত অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকা-, পরিকল্পনা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সে এত পারদর্শী ছিল যে, এত ছোট একটি শিশুকে অফিসের বিভিন্ন বয়েসী আর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সমস্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ তার নির্দেশনায় চলত। সুনামও কুড়িয়েছিল বেশ, তাইতো বিশ্ব সংবাদে তাকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল তখন। এই দুষ্ট ছেলেটি ঠিক তার উল্টো। বাবা, মা সংসার চাকরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দু’টো ছেলে নিজ দায়িত্বেই মোটামুটি বড় হচ্ছিল। তৃতীয় এই ছেলেটি যাচ্ছে তাই। খারাপ বন্ধুদের সাথে বেশি মিশত। লেখাপড়ায় মনোযোগ কখনোই ছিল না। ভাল কাজের স্বীকৃতির মধ্যে আত্মার যে শান্তি নিহিত তা তাকে কখনো কেউ বোঝায়নি বা বোঝানোর চেষ্টা করেনি। একদিন এই ছেলেটি অনেক বড়লোক হল। শহরে, মহল্লায়, গ্রামে, পাড়ায়, পার্টিতে তার বেশ প্রভাব। নামকরাও বেশ। সবাই চেনে। সামনে দামও দেয়। অনেক লোকের কাছ থেকে যেমন চাঁদা নেয় তেমনি অনেক লোককে আবার পোষেও বটে। তাই দৃশ্যত তার কোন শত্র“ নেই বরং ভক্ত আছেন প্রচুর। ক্ষমতা আর দাপট দেখানো এবং নিজস্ব অন্যায় ব্যবসাগুলোকে ঠিকভাবে চালিয়ে নেবার জন্য বিশেষ বিশেষ দলবাজিও করেন। এখন বাবা-মা তাকে নিয়ে বেশ নিশ্চিন্তা। বাকি দুই ছেলে চাকরি করছেন, কোনমতে সংসারটাকে চালিয়ে নিচ্ছেন। কোন ঋণ নেই কারো কাছে। নিপাট ভদ্রলোক এরা। কাউকে বড় পরিসরে সাহায্যও করতে পারেন না, আবার কারো ক্ষতির কোন কারণও হন না। সমাজের চোখে সাদামাটা, সাধারণ, নিম্ন মধ্যবিত্ত।

জ্ঞানীদের চোখে এই দুইভাই-ই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় ধনী ও সুখি। অন্যায় উপার্জন আর নৈতিকতা বর্জিত ক্ষণকালের ক্ষমতা দিয়ে হয়তো কিছু যুগ দাপটের সাথে বসবাস করা যায়। নেটওয়ার্কের সবচেয়ে চূড়ায় অবস্থান করা যায় কিন্তু আউট অব নেটওয়ার্ক হলে তখন? নেটওয়ার্ক বলতেই আমরা বুঝি অন্তত দু’টি বা বহু মাধ্যমে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়া। কিন্তু একপক্ষীয় নেটওয়ার্কও হতে পারে। তখন সেই নেটওয়ার্কের একপক্ষ শুধু তথ্য দিয়ে যাবে আর অপরপক্ষ শুধু তথ্য পেতে থাকবে কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর করতে পারবে না। মৃত্যুর পর মানুষের তা-ই হয়। প্রায় সবকিছুই আমরা খুব সাধারণ চোখে দেখে থাকি। জ্ঞানী হতে হলে অসাধারণ চোখে দেখতে হবে। বিভিন্ন পর্যায় বা পক্ষ থেকে দেখতে হবে। তবেই বোঝা যাবে আসল রহস্য। একটা খুব জনপ্রিয় কৌতুক আছে- শিক্ষক ক্লাসের দুষ্ট ছেলেটাকে পড়ায় মনোযোগ ফিরিয়ে আানার জন্য প্রশ্ন করলেন- আবির, বলতো, তোমার একপাশে যদি জ্ঞান রাখা হয় আর অন্যপাশে যদি টাকা রাখা হয়, তবে তুমি কোনটি বেছে নেবে? আবিরের চটপট উত্তর- কেন স্যার? খুব সহজ, আমি টাকাই নেব। শিক্ষক বললেন- আমি হলে জ্ঞান নিতাম। আবির সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাথে সাথে বলে উঠল- স্যার, যার যেটা অভাব! তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এই ধরনের ছাত্র টাকাকে চিনবে না কি যে শিক্ষক বা যারা এই শিক্ষকের অনুসারী তারা বড়লোক হবে? অর্থের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক খুবই কম। জ্ঞানকে অর্থের মূল্যে কখনোই মাপা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানীরাই সুখি হয়, স্বর্গ পায়। এই নেটওয়ার্কের যেকোন প্রান্তই সচল থাকুক না কেন তা উপকারেই দেয়। মধ্যিখানের মিডিয়া হন স্বয়ং আল্লাহ্ই।

বৃক্ষের পরিচয় ফলেই। আবার একটা বৃক্ষ রোপন করলে যেমন বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার ফল পেতে থাকার ব্যাপারটি থাকে, তেমনি পৃথিবীর সময় তো সময়ের শেষ পর্যায় নয়, ইহ-পরের মহাকালের ক্ষণিক অংশ মাত্র, তাই সুসন্তান, সুবংশধর বা সুকর্ম বা সুবিনিয়োগ থেকেও অনন্তকাল পর্যন্ত এর ভাল ফলাফল পাবার সুযোগ থাকে। তখন নেটওয়ার্ক মৃতব্যক্তির দিক থেকে একপক্ষীয়ভাবে বলবৎ থাকে। মৃতব্যক্তির কিচ্ছু করার থাকে না কিন্তু যা করে ফল পাবার ব্যাপারটি ছিল, তা থেকে ফল পেতে থাকেন। যদি ভাল কিছু করেন তো ভাল কিছুই পাবেন আর খারাপ বা মন্দ কিছু করে থাকলে মন্দই পেতে থাকবেন। দুনিয়ার দিক থেকে সকল নেটওয়ার্কের বাইরে থেকেও কিভাবে জীবন্ত মানুষগুলো মৃতব্যক্তিদেরকে, বিশেষ করে বাবা-মাকে সুখী বা অসুখী রাখছেন তা সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে যেমন সকাল দেখি তেমনি একদিন ষাট/সত্তর/আশি/নব্বই বছর পর একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে মনে হবে- এতোগুলো সময় পেরিয়ে গেল? বুঝলামই না? আজ দেহের সেই টগবগে জৌলুস নেই, মনের সেই কামনা নেই-থাকলেও উপায় নেই, শত রোগে আর জরায় ক্লান্ত এ দেহটি নুয়ে ভেঙ্গে পড়ার অপক্ষোয়। মনে হবে সারাটা জীবন এতো এতো নেটওয়ার্কে থেকে প্রকৃত অর্থে কি উপকার করতে পেরেছি পৃথিবীর বা নিজের? অথচ আউট অব নেটওয়ার্কে যাবার আগে এখন বুঝতে পারছি- সব খেলা ছিল, শুধুই খেলা। তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া/ কি হবে আর কান্দিয়া…/নকল হাটে আসল সোনা গেলাম বেচিয়া…।

লহো তারে বিনাশী, উগ্র বড় মত্ত রহে এ মম
বিলায়ে সবই, খোঁজো রবি, ভাঙ্গো মোর ভ্রম;

শুদ্ধ বিচারি, মগ্ন ধ্যানে করো মর্ম বিদারি
মহাকল্য পটে অবিকল্য করো তিমির বিদূরি।

লেখক: এস জে রতন
কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী।
পাতাটি ৩৭৯০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…

পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই



– এস জে রতন
মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে …
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে।
বাসের পাশের সীটে বসা এক সহযাত্রী হঠাৎ কথা বলে উঠলেন- ভাই, আপনি কি মিডিয়া বা পাবলিক রিলেশন টাইপের কোন কাজের সাথে জড়িত? -কেন? তড়িৎ প্রশ্ন তমালের। -না মানে, কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনাকে এই প্রশ্নটি করা যায়। আপনি নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না, তাই করলাম। -কেন? আমাকে দেখেই আপনার বিশ্বস্ত কেউ মনে হলো? -হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। আপনার মধ্যে একটা সরলতা আছে। -সরলতা মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে? -সবসময় না, তবে বোঝা তো যায়। চটকদার এই মিসডিজিটাল যুগে কারো সরলতা যে যেকোন মুহুর্তে অভিনয় হতে পারে, যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারে তা পাঠকগণ নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করবেন। কিন্তু তাই বলে কি সরলতা বা সারল্য বা সরল এই কথাগুলোকে একদমই বিশ্বাস করবো না? যা কিছু ঠিক তা ঠিকই। আর যা ঠিক নয় তা বজর্নীয় বা পরিত্যাজ্য। তবে চৌকস থাকাটা নিশ্চয়ই ঠিক। না, লোকটির কোন বাজে উদ্দেশ্য ছিল না। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরখ করে, ঐ সহযাত্রীর সবটুকু আচরণ, আচরণের ক্ষণিক ত্র“টি বা বিচ্যুতি বা মুভমেন্ট, অঙ্গভঙ্গি সব অবলোকন করে যা বোঝা গেল তা হলো, সত্যি লোকটির মনস্তত্ত্বে ছাপ ফেলেছে তমালের সাধারণ জেশ্চার-পোশ্চার, কথাবলা, চাহনী, কন্ডাক্টরের সাথে ভাড়ার লেনাদেনা সবকিছু। লোকটির গন্তব্যে বাস পৌঁছে যাওযায় নেমে গেল সে। যাবার সময় ভিজিটিং কার্ডটা চেয়ে নিল। তমাল ভাবছিল, লোকটি তার মধ্যে কি দেখল যে এমনি এমনিতেই ভক্ত হয়ে গেল? বগুড়ার বেতগাড়ির এক অফিসে সন্ধ্যায় পৌঁছল তমাল। লাগেজটা গেস্টরুমে রাখতে না রাখতেই ঘন্টা কয়েক আগের সহযাত্রীর মোবাইল কল- ভাই, ভালভাবে পৌঁছতে পেরেছেন? বাকি পথে কোন সমস্যা হয়নি তো? ভদ্রতা করে তমাল বলল- আপনার বাড়িতে সবাই ভাল আছেন তো? -হ্যাঁ, ভাল আছে। আর আপনার কথা আমার ওয়াইফের সাথে বলেছি। -হায় হায়, কি বলেছেন? আমার আর আপনার মাঝে এমন কিছুই হয়নি যা গল্প করে বলা যায়। -না, তবে কেন যেন আপনার গল্প করা যায়।
চর। ধু ধু বালু আর বালুকারাজি। কাশবনের সাদা সাদা ফুলগুলো দেখতে ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বহ্মপুত্রের তীর ধরে হাঁটছিল তরুণ কয়েকজন শিক্ষার্থী। বহ্মপুত্রের বরপুত্র আর নেই, সে এখন -এই খানে এক নদী ছিল জানলো না তো কেউ, আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ… টাইপের হয়ে গেছে। অর্থাৎ নদীই ইতিহাস আর নদ তো দূরের কথা। বালুচরের আড্ডায় সেখানকার এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী অন্ধভক্ত হয়ে গেল তমালের। আড্ডাতে সবাই গান করেছে, কৌতুক করেছে, রস আলোচনা করেছে কিন্তু এরই মধ্যে কেউ না কেউ যে অনন্য হয়, শহীদুল্লাহর আগ্রহটাই যেন তা প্রমাণ করে দিল। অনেকের মনের কথা অনেকেই বলতে পারে না, কিছুজন বা কেউ একজন বলে। বাকিরা সায় দেয় মৌনতায় বা অঙ্গভঙ্গিতে। কিছুদিন পর শহীদুল্লাহ দুইজন বন্ধু নিয়ে হাজির বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। তমালকে তাদের সাথে চরের এক অনুষ্ঠানে যেতে হবে। সেখানে শুধু তমালকে উদ্দেশ্য করেই গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার অন্যান্য বাউল শিল্পীরাও থাকবেন সেখানে। চরের সহজ, সাধারণ আর সরল মনের মানুষগুলোকে গান শুনিয়ে সুনামের বিস্তৃতি কতটা বাড়ানো যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এদের হৃদয়ের সবচেয়ে আবেগঘন জায়গায় ঠাঁই করে নেয়া যাবে আজীবনের জন্য তা অনুমান করা গেল। নির্দিষ্ট দিনে চরের অজোপাড়ায় আমন্ত্রিত হয়ে হাজার মানুষের সামনে তবলা-হারমোনিয়াম আর স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত বেহালায় চলতে থাকলো লালন, হাছন, নজরুল, মারফতি, মুর্শিদী, আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন, মান্নাদেসহ আরো কত রকমের পুরোনো দিনের গান। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, তারপর ভোর অবধি তমালসহ স্থানীয় অন্যান্য শিল্পীরা মিলে প্রায় শতাধিক গান গীত হলো অনুষ্ঠানে। গানের ফাঁকে চা, দর্শকদের সাথে আড্ডা, কথা বলা, অনুরোধের গান গাওয়া, দর্শকদেরকে সাথে নিয়ে গান গাওয়া, মঞ্চে দর্শকদেরকে সুযোগ দেয়া কত কিছুই না হলো। অনুষ্ঠান শেষে এই চরে আরো চার-পাঁচদিন থাকার আমন্ত্রণ এলো। বিভিন্ন বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা কোনভাবেই ছাড়তে চাইলেন না তমালকে। গানের মধ্যে যে এতো আত্মিক ভাললাগা আছে তা তারা আগে কখনো ভাবেনইনি। কিন্তু হলে ফিরে আসতেই হলো তমালকে। কারণ পরীক্ষা, ক্লাস আরও কত কার্যক্রম পড়ে আছে। চলে আসার সময় হাজার লোকের ছলছল চোখ যেন বার বার বলছিল- তুমি আমাদের অন্তরের কেউ, আমাদের রেখে যেও না। তোমার সুরের পরশে আবিষ্ট আমরা অন্ধ ভক্ত তোমার। হৃদয়ের ভেতর থেকে যে ভালবাসার উদ্গীরন ঘটে তার প্রকাশ বোধহয় এমনি। এ অপ্রকাশ্য অসাধ্য কর্ম অক্ষরে বানানো শব্দের ঘেরে। অঞ্জনদত্তের সেই গানটি যেন নেপথ্যে ভেসে আসছিল ভাবের সেই করুণ আবহে- ও গানওয়ালা, আরেকটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাবার নেই। কিচ্ছু করার নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম পূরণ ও জমা দেয়ার কাজ চলছে। মাহিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের মাঠে বন্ধু বান্ধবসহ ভর্তিফরম পূরণ করে কাগজ-পত্রগুলো সাজাচ্ছিল। হঠাৎ একটি অপরিচিত মেয়ে মাহিনের ভর্তি ফরমটা হাতে তুলে নিয়ে প্রশংসা শুরু করলো- এতো সুন্দর লেখা? এতো সুন্দর করেও হাতে লেখা যায়! কার এটা? মাহিনের বন্ধুরা বলল- মাহিনের, এই ছেলেটির লেখা এটা। মেয়েটি- আর কিছু তো আপনার দরকার নেই। এই লেখা দিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব। মেয়েটির কোন কাজের তাড়া ছিল হয়তো, তাই বাই বলে দ্রুতই প্রস্থান করলো সে। পৃথিবীটা গোল, সময়ের আবর্তনে বিভিন্ন প্রয়োজনে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের সাথে মানুষের পরিচয় ঘটে, আবার বিচ্ছেদও হয়। কিন্তু প্রয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু যখন ঢাকা শহর, তখন তো যে কারো সাথেই যেকোন সময় দেখা হয়ে যাওয়াটা সাধারণই বটে। বিশ বছর পর ঢাকা মেডিকেলের সামনের ফুটপাতে হেঁটে যেতে দেখা হলো মাহিনের সাথে সেই মেয়েটির। বয়স আর ছাত্র-চাকরিজীবি এই পার্থক্যের কারণে মাহিনের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে কিন্তু তবুও চিনতে কষ্ট হলো না সেই মেয়েটির। -এ্যাই, ভাই আপনি মাহিন? কিছু মনে করবেন না, হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। চশমা খুলতে খুলতে -হ্যাঁ, কিন্তু আপনি? -আমাকে আপনার মনে নাও থাকতে পারে। তবে আপনাকে মনে রাখতে পেরেছি আপনার চমৎকার হাতের লেখার জন্য। সেদিন আমার অনেক ব্যস্ততা ছিল বলে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু মস্তিষ্কের মেমোরীতে আপনার মুখচ্ছবি আর নামটা চিরস্থায়ী হয়ে যেন গাঁথা হয়ে রইল। এমনটা কেমন করে হয় জানি না, তবে এটা হতে পারে বিশ্বাস করি। কারণ মানুষের মন আর মস্তিষ্কের ভেতরে বেশি ভাললাগার বিষয়গুলো স্বয়ংক্রীয়ভাবেই দাগ কেটে যায়। তাই কষ্ট করে মনে রাখার মতো করে কিছু করতে হয় না। আমার বিশ্বাস আমার এই কথাগুলোও আপনার ভাল লেগেছে, এটাও মনে থাকবে। আবার দেখা হলে জানাবেন। চলে গেল মেয়েটি, না এখন সে মেয়েটি নয়, নারীটি। সৌম্য, ভদ্র, সুন্দর করে কথা বলতে পারা এক নারী। তার চলার গতিপথে অনেকটা ক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকলো মাহিন।

লোকাল ট্রেন। গাদা গাদা মানুষ, রাত্রের জার্নি। কোনমতে ধরে ঝুলে থাকার মতো একটা হ্যান্ডেল নাগালে পেলেই যেন যথার্থ স্বস্তি। এতো ভীড়ের মধ্যেও কচি একটা কণ্ঠের অনর্গল প্রমিত ভাষায় কথপোকথন যেন আকর্ষণ করছিল সবাইকে। ভীড় ঠেলে কাছে যাওয়া প্রায় অসম্ভবই, কিন্তু অনেক কোলাহলের মাঝেও সুন্দর উচ্চারণ আর স্পষ্ট এই কণ্ঠস্বরের মানুষটিকে না দেখলে যেন কোনভাবেই নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না তানহা। তানহা আবৃত্তির ছাত্র। শুদ্ধ উচ্চারণের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার পার্থক্য গুলো কেমন হয় তা নিয়ে আগ্রহের যেন শেষ নেই। অংকের মতো স্ট্রেইট, নো কম্প্রোমাইজ আর নিরস একটি সাবজেক্টে পড়াশোনা করলেও ভাষা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই তার। তার সাথে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকা আরও দুই বন্ধুকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল সে। বন্ধুরা টিজ করে বলল- ঐ যে গেল, ভাষাবিদ, উচ্চারণবিদ; কোথায় কোন কণ্ঠ শুনেছে আর অমনি তার উৎস উদ্ধারে পাগল হয়েছে। তানহা মনে মনে বলল- কবি নজরুলকেও তার সময়ের মানুষরা পাগল বলে ডাকতেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, দশ-বার বছর বয়সী একটি কিশোরী মেয়ে। পরনে ময়লা নোংরা থ্রিপিস। চুলগুলো এলোমেলো তবে ব্যাকব্রাশ করে গুছিয়ে বাঁধার চেষ্টা করেছে মনে হলো। কিন্তু এতো ভীড় আর ছোটখাট দু’একটি পোটলা-পাটলা বয়ে নেবার কারণে ঘর্মাক্ত আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটা সীটের সাথে ঠ্যাস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট একটি দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে সীটের কাছে মাঝফ্লোরে বস্তায় বসে আছে তার মা। কিশোরী এই মেয়েটিই এতো সুন্দর করে কথা বলে যাচ্ছিল তার মা এবং ছোট্ট কোলের ভাইটির সাথে। তানহা- চাচি, আপনার মেয়ে তো খুব চটপটে, এফএম রেডিও’র জকিদের মতো করে কথা বলে। কোথায় কাজ করেন আপনি? কোথায় থাকেন? -বাবা, মধ্যবাড্ডায় এক সাহেবের বাসায় কাজে রাখছিলাম এই মাইয়াডারে। সাহেবের পেলেতে (প্লে ক্লাস) পড়া মাইয়ারে পারাইভেট কারে কইরা ইসকুলে নিয়ে যাইত, কেলাস চলা পর্যন্ত অপেক্ষা কইরা তারপর আবার ঔ কারে কইরা বাসায় ফিরত। ইসকুল আর সাহেবদের সাথে থাইক্যা ভাষা চেইঞ্জ হইয়্যা গেছেগা। -আপনার মেয়েকে তারা নতুন জামা কাপড় দেয়নি? বাড়ি ফিরছে নোংরা জামা পরে। -নতুন জামা দিছিল, সাহেবদের বাসার ড্রাইভারকে বোধহয় তারা কইয়া দিছে, নতুন জামা রাইখ্যা যাইতে কইছে। বিশ্বাস করে নাই আমগোরে, যদি মাইয়্যারে আর ফিরাইয়্যা না দেই। -তোমাদের বাড়ি কোথায়? মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো তানহা। -ইসলামপুরে। -ইসলামপুরের ভাষা ভুলে গেছ? -না, তবে সাহেবদের ভাষা আমার খুব ভাল লাগে। তানহা বুঝতে পারলো এই মেয়েটির মন ভাষার শুদ্ধরূপটি আকৃষ্ট করেছে বলে রপ্ত করে নিয়েছে সহজে, আবার মেয়েটি এমন করে কথা বলার ব্যাপারটিও আকর্ষণ করলো তানহাকে। যেন মনের গহীনে দাগ কেটে গেল।

ময়মনসিংহের একটা মেসে থেকে অনার্স পড়ছিল তাহের। লম্বা পাঞ্জাবী মাথায় টুপি। এই তার নিত্যবেশ। নামাজ-কালাম অধিকাংশ সময় মসজিদেই পড়ে। কিছুলোক নামাজ নিয়মিত পড়লেও ফজরটা নিয়ে প্রশ্ন করলে নামাজ কাযা হওয়ার উত্তরটাই বেশি আসে। তাহেরের ফজর কখনো মিস হয়নি। টগবগে যুবক সকালে মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ে ফেরার সময় তসবিহ জঁপতে জঁপতে ফেরে। ভীষণমাত্রায় আল্লাহবিশ্বাসী। অনেক ঘটনা থেকে একটি ঘটনা তুলে আনা যেতে পারে। একবার তার কষ্টার্জিত টিউশনীর টাকায় কেনা শখের সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা পড়ার কক্ষ থেকে চুরি হয়ে যায়। পাশের কক্ষের বন্ধু রহিমের কাছে ব্যাপারটা বলল। রহিম তাহেরের ভাল বন্ধু, তাহেরের আবেগটা ভাল বুঝতে পারে। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে কেনা ক্যালকুলেটরের জন্য তাহেরের বুকে কত কষ্ট হতে পারে তা সহজেই অনুমান করতে পারলো রহিম। বোঝানোর চেষ্টা করলো। চিন্তিতও হলো। ভাল বন্ধুর মন খারাপ হলে অপর বন্ধুর কি আর ভাল লাগতে পারে? রহিমের মন খারাপ দেখে উল্টো তাহেরই রহিমকে সান্ত্বনা দিতে থাকলো। বলল- দোস্ত, এটা হতেই পারে। তাছাড়া আরও বড় কোন ক্ষতি যদি হতো। তাছাড়া যে নিয়েছে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজন ছিল বলেই তো নিয়েছে। আমার না হয় কষ্ট হবে আবার আরেকটা ক্যালকুলেটর কিনতে, কিন্তু যে নিয়েছে আমারটা সে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজনটা মিটিয়ে খুশি হয়েছে। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু করতে তো খুব একটা পারছি না। এভাবেইও যদি কিছু করা হয়ে যায়, তো মন্দ কি? আল্লাহ তার সৎ বুদ্ধি উদিত করুক, আর মাফ করে তার জ্ঞান বৃদ্ধির সুযোগ করে দিন। এরপর কোনদিনও আর এ ব্যাপারে ইস্ উহ্ বা আফসোস করে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি তাহেরের মুখে। তাহেরের এই আচরণ সত্যি বিমোহিত করে রহিমকে। মনের ভেতরে আজো এই ঘটনাটি দাগ কেটে আছে। হাদিস কোরআনে এই বিষয়গুলো বর্ণনা করা থাকলেও, কাছের কারো কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ দেখলে তখন তা মনে রেখাপাত করে। রয়ে যায় আজীবন।

জেলা শিল্পকলার আয়োজনে জাতীয় এক অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলছিল। ক্যাপ মাথায় শিল্পকলার গানের শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী মাসুম নজরুল সঙ্গীত গেয়ে মাতিয়ে দিলেন পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকগণ মাসুমের হাতে গুঁজে দিচ্ছিলেন চকচকে টাকার নোট। সেই অনুষ্ঠানে একটি মেয়ের গান তার কাছে ভাল লেগে যায়। মেয়েটি দশ-বার বছর বয়সী হবে। গান গাওয়ার পর পানি খাবে বলছিল। মাসুম মেয়েদেরেকে খুব একটা পাত্তা কখনোই দিত না। কিন্তু এই মেয়েটার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হলো কেন সে জানে না। দু’একজন ছেলে মেয়েটির পানি পানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পানি আনতে চলে গেল। মাসুম আজ যেন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। ছুটে গেল পানি আনতে। একটা গ্লাসে করে দ্রুতবেগে পাশের এক টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে মেয়েটির হাতে তুলে দিল মাসুম। মেয়েটি পানি পান করছে আর মাসুম হা করে তাকিয়ে দেখছে পানি পানের দৃশ্য। চিকন চাকন মায়াবী চোখের মেয়েটিকে কেন যেন ভালবাসার মতো ভাল লেগে গেল। তার উঁচু গ্রীবা বেয়ে পানি ঢক ঢক করে বয়ে যাওয়ার সময় যে ছন্দের সৃষ্টি হলো, তা যেন বুকের ভেতরে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দিল। মাসুম এভাবে কখনোই কাউকে ভাবতে পারেনি। কিন্তু আজ তার কি হলো? মেয়েটি ধন্যবাদ ভাইয়া বলে মিষ্টি করে হাসলো। ডাগর চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল- ভাইয়া আপনি এতো সুন্দর করে গাইলেন, যেন নজরুল সঙ্গীত নতুন করে অসাধারণ মনে হলো আমার কাছে। অনেকদিন পর হঠাৎ এক মার্কেটে মেয়েটির সাথে দেখা হলো মাসুমের। মাসুম পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। মাসুমের লম্বা চুল আর পরিচিত স্টাইলে মাথায় ক্যাপ পরা অবস্থায় দেখে চিনে ফেলল মেয়েটি আর ডেকে বলল- ভাইয়া, মনে আছে? কোন এক অনুষ্ঠানে পরম যতœ করে এক গ্লাস পানি খাইয়েছিলেন আমাকে। -হ্যাঁ, তোমাকে কেন যে এতো ভাল লেগেছিল সেদিন, জানি না। হৃদয়ের কোন এক অংশে তোমার না দেখা স্পর্শটি হয়তো দাগ কেটে গিয়েছিল তাই। -আমিও শুধু আপনার এক গ্লাস পানির জন্য মনে রেখেছি আপনাকে; কষ্ট করে নয়, এটাও দাগ কেটেছিল আমার মনে।

কোচিং-এ ক্লাস নিয়ে ফিরছিল কিবরিয়া। ফার্মগেট থেকে বাঁ পাশের ফুটপাত ধরে কাওরান বাজারের ভেতর দিয়ে ক্রস করে এফডিসির দিকে যাচ্ছিল। জেলা শহর থেকে আসা এক ভদ্রলোক তার ছেলের কাছে কাঁঠাল বাগানের কোন এক মেসে যাবেন। বেশ কয়েকবার ভুল করে কাওরান বাজারের ভেতরে ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে বাজারের এক দোকানে বসে চা পান করছিলেন। কিবরিয়াও সেখানে চা পানের জন্য বসলেন। -ভাই চা দাও তো। -স্যার আদা চা না দুধ চা খাবেন? -আদা চা-ই দাও। কণ্ঠের ব্যবসাই করি, কণ্ঠই যদি ঠিক না থাকলো তবে কমেন করে হবে? লেকচার আর লেকচার। -কিসের লেকচার স্যার? -কোচিং-এর লেকচার। পাশে বসে নীরবে চা পান করতে থাকা ভদ্রলোককে ক্লান্ত লাগছিল। বুঝতে পারা যাচ্ছিল কোন সমস্যায় পড়েছেন তিনি। -চাচা, আপনি আশে পাশেই কোথাও জব করেন? -না, আমার ছেলের কাছে এসেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি, উল্টা-পাল্টা কি বললেন, এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্তই হয়ে পড়েছি। ঢাকা শহরের অভিজ্ঞতা কখনোই ভাল ছিল না। মানুষগুলো কেমন যেন। -চাচা, আমার হাতে তো সময় নেই। তবে আপনাকে লোকেশন বলে দিচ্ছি আর ঠিকমতো করে বুঝিয়ে দিচ্ছি, আপনি এভাবে যান ঠিক ঠিক আপনার ছেলের বাসা পেয়ে যাবেন। রাত্রে ভদ্রলোক কিবরিয়াকে কল করে ধন্যবাদ দিলেন আর জানালেন উনি ঠিকমতো তার ছেলের বাসা খুঁজে পেয়েছেন। মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মনের অবস্থা সহজেই বোঝা সম্ভব। তবে তার জন্য কিবরিয়ার মতো গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। অন্যের মনে দাগ রেখে যাওয়ার মতো কাজের জন্য অনেক বড় কাজ করতে হয় না। ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েও মানুষের মনে ঠাঁই করে নেয়া যায়। দশ বছর আগের কথা, ভদ্রলোক এখনো কল করেন, ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করেন। ভদ্রলোকের একটি কথায় বেশ অনুপ্রাণিত হন কিবরিয়া, তা হলো- আপনার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর আছে। সেই বিশ্বাসই অপরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।

মানুষ। অনেক সম্ভাবনার এক স্পষ্ট জ¦লজ্বলে উদাহরণ। সৃষ্টির সকলকিছুর মধ্যে সেরা এই জীবটি মানবিক হবে, হবে দাগকেটে যাবার মতো স্মরণীয়। এটাই কাম্য, কামনা। পৃথিবীর গোলাবর্তে ঘূর্ণায়মান সৌরমন্ডলে এই প্রাণীটির সমাদর অনেক। মহান আল্লাহ অনেক শখ করে আর বিশ্বাস নিয়ে বানিয়েছেন এই মানুষকে। এই মানুষের কাছে তাই সর্বোচ্চ ভালকিছুর প্রত্যাশা সকলকিছুর। মনে রেখাপাত করে, উত্তম কাজের স্মরণ করে প্রশংসায় ভক্তিতে আবেগাপ্লুত হবে কেউ এটাই একে অপরের কামনা। সাধনা এটাই হওয়া উচিৎ। না হলে মানুষ নামটিই বেমানান হবে। সমাজে এমন লোকের অভাব নেই যারা অন্যকে কষ্ট দিতে পছন্দ করে। অন্যকে বোকা বানিয়ে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধ্বংস ডেকে আনতে যারা প্রতিমুহূর্তে চিন্তা করে, তারা মানুষ নয়। তারা অর্থব, বেকুব। সাময়িক লাভকে তারা দীর্ঘমেয়াদী সুখ মনে করে মিথ্যে আস্ফালন করে। সময়ের পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্য এরা বোঝে না। অসীম সময়ের ক্ষুদ্র অংশকে অনেক বড় সময় ভেবে ভুল করে। মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে অন্যের মনে ঠাঁই নেবার চেষ্টা থাকা উচিৎ। মনে ঠাঁই নেবার ব্যাপারটা অতো সহজ নয়। মন বড় বিচারক। সে কখন কিভাবে বিচার করে কাকে বেছে নেবে তা বোঝা মুশকিল। মন শুধু মন ছুঁয়েছে, ও সে তো মুখ খোলেনি। ও হো হো হো…। সুর শুধু সুর তুলেছে, ভাষা তো দেয়নি। তাই মন ছুঁতে চাইলে মনের মতো হতে হবে। ভেতরকার আলো প্রজ্জ্বলিত হলেই কেবল মন ছুঁয়ে দেয়া যায়। অন্ধকার, কালিমা আর অবৈধ কৌশল মনের গহীনে রেখে শুদ্ধ হওয়া যায় না। সৎ, পরোপকারী হলে তার জন্য ভাল অপেক্ষা করবেই। যদি দৃশ্যত ভাল নাও দেখা যায়, তাও কোন সমস্যা নেই, মানসিক যে তৃপ্তি পাওয়ার ব্যাপার থাকে তা স্বর্গসম। পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়ে আছেন, তারা কোন না কোনভাবে মানুষের মনকে জয় করেছেন। সে কারণেই মানুষ তাদেরকে যুগের পর যুগ স্মরণ করে।

বিচলিত তব নিঃস্ব হও পরের তরে তৃপ্তি তোমা হতে না রবে বেশি দূরে
হৃদে না বসি আসন করো অন্য হৃদে মন-প্রাণে থাকো পুত-পবিত্র জাগ্রত কি নিদে
দাগ কেটে যাও প্রতি মনে শুদ্ধ সত্যের তরে থাকো জীবিত অনন্তকাল হও অমর মরে।
লেখক: এস জে রতন কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী
sjratan@gmail.com
পাতাটি ৪৭৪৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন ত কিছু করতে যে চায় মন। করে আনচান হৃদয়, । খন্ডিত বা…


বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা -এস জে রতন মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ; বিশ্বাসে তবে…


আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো। হ্যালো,…


পদচিহ্ন: দাগ কেটে যাই

- এস জে রতন মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে দেওয়ানা বানাইছে ... কি যাদু করিয়া বন্ধে…