প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “বাংলার মাটিতে বসবাস করে যাদের অন্তরে ‘পেয়ারি পাকিস্তান’, তাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। এদেশ আর যেন অন্ধকার যুগে ফেরৎ না যায়, সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। আর যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে যারা লাখো শহীদের রক্তখচিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল, তাদের যেন জাতি কোনোদিন ক্ষমা না করে।”
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার উন্নয়নে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। সেখানে বাংলা ভাষার চর্চা ও শেখানোর ব্যবস্থা থাকবে না কেন? অবশ্যই থাকতে হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
শনিবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিউশন মিলনায়তনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশ নিম্মমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হচ্ছে। আগামী মার্চে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছবে। এই উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে- সেটিই শহীদদের প্রতি আমাদের অঙ্গিকার।”
পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস ও দেশকে পাকিস্তানি ধারায় পরিচালিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশকে যেন পাকিস্তানের প্রদেশ বানানোর চক্রান্ত হয়েছিল। তখন মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির প্রতি ক্ষমতাসীনদের তোষামোদি-খোসামোদি দেখা গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের দল করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “অনেকেই বলেন, জিয়াউর রহমান নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা! তার বহুদলীয় গণতন্ত্র তো যুদ্ধাপরাধীদের দল করার সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসন করা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে দূতাবাসে চাকরি করার সুযোগ করে দেওয়া।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর একটা সময় দেশের মুক্তিযোদ্ধারাও নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে সাহস পেতেন না। সরকারি চাকরি পেতেও মুক্তিযোদ্ধা কথাটি লিখতে ভয় পেতেন। কারণ, তাহলে চাকরি পাবেন না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই অবস্থাই বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল। এদেশে রাজাকারের শাসন কায়েম হয়েছিল।
তিনি বলেন, তবে তার সরকারের নয় বছরের শাসনে এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা এখন নিজেদের পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করেন। তারা এখন আর ভীতসন্ত্রস্ত হন না। এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসগুলোও সামনে আসছে। মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাবোধ ও আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। এই আত্মবিশ্বাসটা যেন হারিয়ে না যায়। এমন কোনও অন্ধকারে দেশ যেন আবার না পড়ে। ওই পরিবেশ যেন বাংলার মাটিতে আর না আসে, সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। আবার যেন সেই ধরনের বিপদে দেশের মানুষ পড়ে না যায়।
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অনেকেই এদেশের মাটিতে বসবাস করলেও তাদের অন্তরাত্মা পড়ে থাকে তাদের পেয়ারি পাকিস্তানে। যাদের হৃদয় থাকে পাকিস্তানে, কিন্তু বাংলাদেশে থেকে সবরকমের আরাম আয়েশ ফল ভোগ করে, তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। আর এই পেয়ারি পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে।
ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রতি গুরত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা না পড়ানো এবং দাওয়াৎ কার্ড, সাইনবোর্ড ও উচ্চআদালতের রায় ইংরেজিতে লেখার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অনার্সে বাংলা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে নেওয়া যায় না। এ বিষয়টি তার জানা ছিল না। এটা কেন, খোঁজ নিতে হবে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা বিভাগ থাকবে না, বাংলার চর্চা থাকবে না, এটা হতে পারে না।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আজকাল দেখা যায়, বিয়ের দাওয়াত কার্ডও ইংরেজিতে লেখা হয়। এটা কেন লিখতে হবে? বিদেশিদের জন্য, ইংরেজি ভাষাভাষীর জন্য সেটা হতে পারে। তবে এদেশে বিয়ের কার্ড কেন ইংরেজি ভাষায় লিখতে হবে? এর মধ্যে তো কোনো আলাদা মর্যাদা নেই। এটা তো ব্যাধির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এগুলো কীভাবে সুরাহা করা যায়, উপায় বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে অন্য ভাষাও শিখতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে যোগাযোগ বাড়াতে এটা জরুরি। এই সময়ে যে যত বেশি ভাষা শিখতে পারে তার জন্য তত ভালো। তবে সবার আগে ভালোভাবে বাংলা ভাষা শেখাটা জরুরি।
তিনি বলেন, অন্য ভাষা শেখার বিরুদ্ধে তিনি নন। অন্য ভাষা শিখতে না পারলে উন্নত হওয়া যাবে না, এই ধারণায়ও তিনি বিশ্বাসী নন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে ভাষার জন্য শহীদরা রক্ত দিয়েছেন, সে ভাষা শিখব না কেন? চর্চা করব না কেন, মর্যাদা দেবো না কেন? কেবল একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা চর্চা করব- এটা হতে পারে না। মাতৃভাষার চর্চা অপরিহার্য।
বিচারের রায় ইংরেজিতে লেখা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালতের রায় ইংরেজিতে লেখা হয়। অনেকে আছেন ইংরেজি বোঝেন না। তার উকিল যা বোঝাবেন তাকে সেটাই বুঝতে হচ্ছে। তবে এখন নিম্নআদালতে মোটামুটি বাংলায় রায় লেখা শুরু হয়েছে। আশা করি, উচ্চআদালতেও সেটি শুরু হবে।
ইংরেজি ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে লেখা ও বলার মাধ্যমে মাতৃভাষার বিকৃতিকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেখা যায় অনেকে বাংলা ভাষা ইংরেজি টোনে কথা বলেন, এটা কেন? উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি শেখা যেতে পারে। কিন্তু যারা বাংলাদেশে বড় হয়েছে, তারা কেন ইংরেজি ঢংয়ে বাংলা বিকৃত করে বলবেন?
বক্তব্যের শুরুতে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে এর গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালির প্রতিটি অর্জনই আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরেই করে আদায় করতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। সেই সংগ্রামের পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। প্রতিটি অর্জনের পেছনে এদেশের জনগণের ত্যাগ রয়েছে।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আবদুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন প্রমুখ। পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও উপ-প্রচর সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।












